Friday, February 20, 2009

আল্লাহ্‌র প্রতি মদনের চিঠি[প্রথম অংশ]

মাসুদ রানা

সুকুবা, জাপান

আল্লাহ্‌র প্রতি মদনের চিঠি

[প্রথম অংশ]


প্রিয় আল্লাহ্‌,

সবিনয় বিনীত পূর্বক জানাইতেছি যে, আমার নিন্মোক্ত যোগ্যতা সম্পন্ন পাত্রী প্রয়োজন।

১.পাত্রীকে ৫ফুট২-৩ ইঞ্চি লম্বা হইতে হইবে। ৫ ফুট ১ হইলেও কোনরকমে চলিবে, কিন্তু ইহার নিচে হওয়া যাইবে না।

২. গায়ের রঙ অবশ্যই ফর্সা হইতে হইবে। ইহাতে কোন রকম ছাড় দেয়া যাইবে না।

৩.পাত্রীর চোখ, নাক অবশ্যই সুন্দর হইতে হইবে। হরিণ চোখ প্রধাণ্য পাইবে। নাক মোটা, চ্যাপ্টা, খাটো, বেশী উঁচু কোনটাই হওয়া যাবে না। চেহারা অবশ্যই রূপসী পর্যায়ের হইতে হইবে। ঐশ্বরিয়া রায় ১০০ পাইলে আমার পাত্রীকে ৯০ তো পাইতেই হইবে।

৪. পাত্রীকে স্লিম হইতে হইবে। মোটা কিংবা শুকনা হওয়া যাবেই না।

৫. চুল ঘন, লম্বা ও সিল্কি হইতে হইবে। হাঁটা সুন্দর হইতে হইবে। হাসি খুবই সুন্দর হইতে হইবে।

৬. পাত্রীর বয়স ২৩ হইতে হইবে. ২২ হইলেও বিবেচনা করিয়া দেখিব। আমার বয়স যেহেতু ২৮, সেই কারণে ৫ বছর পার্থক্যই সবচাইতে ভাল দেখাইবে।

৭. পাত্রীকে কথায় চটপটে হইতে হইবে। রসিকতা করিতে এবং রসিকতা বুঝিতে পারিতে হইবে।

৮. পাত্রীকে অনার্স ২য় কিংবা ৩য় বর্ষে পড়িতে হইবে। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী প্রধাণ্য পাইবে। ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হইলে আরো ভাল হইবে। এতে কিরিয়া আমার ছেলেমেয়েদেরও মেধাবী হইবার সম্ভাবনা বাড়িবে।

৯. পাত্রীকে নম্র, ভদ্র হইতে হইবে। আমার পরিবারকে নিজের পরিবার বলিয়া মানিয়া লইতে পারিবে, এমন পাত্রী হইতে হইবে।

১০. মেয়ের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো হইতে হইবে। শুধু মেয়ের বাবা মা নহে, তাহার চাচা, মামা, খালা, খালু সবাইকেই যোগ্যতাসম্পন্ন হইতে হইবে- তাহাদিগকে কালচার বুঝিতে পারিতে হইবে।


আল্লাহ্‌, উপরের যোগ্যতা যদিও খুব বেশী নহে, তাহা হইলেও, গত ৩ বছর আমার মা-বাবা, খালা-খালু, চাচা-চাচী সবাই মিলিয়া খুঁজিয়াও একটা মেয়ে পছন্দ করিতে সক্ষম হয় নাই। সেই কারণে, নিরুপায় হইয়া, আপনার কাছে আমার আকুল আবেদন, উপরের যোগ্যতা সম্পন্ন পাত্রী তৈয়ার করিয়া অনতিবিলম্ব ফেরেশ্‌তা জীবরাইলের মারফত প্রেরণ করিয়া এই বান্দাকে বাধিত করিবেন।


আপনার একান্ত অনুগত

মদন

বাংলাদেশ




মদন চিঠিটা পোষ্ট করার সময় ভাবল বাংলাদেশ থেকে নাকি সাধারণ চিঠি হারিয়ে যায়, তাই রেজিষ্ট্রার চিঠি পাঠানোর জন্য, জীবরাইলকে মোবাইলে ফোন করল। জীবরাইল আল্লাহ্‌র কাছে চিঠিটা নিয়ে যাওয়ার জন্য পরদিন মদনের কাছে আসল। জীবরাইল মদনকে ভাল করে চিনত, অনেকটা বন্ধুর মতই। তাই কি চিঠিতে কি লিখেছে আর কৌতুহল সামলাইতে না পেরে জিজ্ঞেস করে ফেলল যে চিঠিতে মদন কি লিখেছে। মদনও জীবরাইলকে বন্ধু মনে করত বলে চিঠিটা খুলেই পড়তে দিল। জীবরাইল খুবই মনোযগ দিয়ে চিঠিটা পড়ল এবং তার পরের কথোপকথন নিচে দেয়া হল। আমি ঐদিন পোষ্ট অফিসেই ছিলাম। পাশে দাঁড়িয়ে ওদের কথাবার্তা শূনতে শুনতে আমার মনে যেসব চিন্তার উদয় হয়েছে সেইগুলো ওদের কথাবার্তার মাঝে উল্লেখ করব।


জীবরাইলঃ মদন, তুমি কি মনে কর, এমন মেয়ে বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীতে আছে?

মদনঃ নাই মনে হয়। সেই কারনেই তো আল্লাহ্‌কে প্যাকেজ অর্ডার দিচ্ছি।

জীবরাইলঃ মদন, তোমার বিয়ে করার উদ্দেশ্য কি?

মদনঃ বয়স ২৮ হয়েছে। এইটাই নাকি বিয়ের জন্য পারফেক্ট বয়স। সবাই তাই বলে। আমিও তাই মনে করি। তাই এখন বিয়ে করব।


তোমার বিয়ের বয়স হয় নাই

হায় আল্লাহ্‌, মানুষ এমন কেন হয়? তুমি জানো আল্লাহ্‌, এই ধরনের অজ্ঞতা আমাকে কত কষ্ট দেয়।

বিয়ের বয়স। বাংলাদেশের মানুষ হয়তো ২৯ কে মাঝে রেখে ২৮-৩০ কে বিয়ের বয়স ধরে। যদি জিজ্ঞেস করি, কেন? কোন ঊত্তর দিতে পারে না। কিন্তু আমি যখন ২৪ এ বিয়ের কথা বললাম, সবার মুখে একই কথা, বিয়ের বয়স হয় নাই। মানে কি? ও আল্লাহ্‌, কে তাদেরকে বিয়ের বয়স ঠিক করে দিতে কে বলেছে? তুমি তো কোরানে কখনো বলো নাই। হাদীসে নাই। তাহলে?


হাদীসে রাসুলুল্লাহ্‌ বলেছেন, যখনই বৌয়ের দেখাশোনা করার যোগ্যাতা হবে তখনই বিয়ে করতে।কারো সেই যোগ্যতা হয় ১৮ তে, কারও হয় ২৪ এ, কারো হয় ৩০ এ, কারো হয় ৩৫ এ আর কারো ৪০ এও হয় না, অলস ধরনের লোক হলে। তাহলে কেন এই ২৮-৩০ ফিক্সড্‌ করে দেয়া?!


বিয়ের কোন বয়সই নাই, তাহলে মানুষ কেন এই কথা বলে? আল্লাহ্‌ যেখানে বিয়ের কোন বয়স দেন নাই, সেইখানে এরকম ফিক্সড্‌ করে বয়স ঠিক করে দেয়া আমার কাছে আল্লাহ্‌র সাথে অভদ্রতার শামিল মনে হয়।


নিজে পারফেক্ট মেয়ে চাই, কিন্তু আমরা নিজেরা কি?

মদন যদি নিজের দিকে একটু তাকিতে দেখত, তাহলে দেখতে পেত তার এবং তার ফ্যামিলীর কত লিমিটেশন আছে। মদন যদি টম ক্রুযের মত হ্যান্ডসামও হয়, বিল গেট্‌সের মত ধনীও হয়, আইনষ্টাইনের মত জ্ঞানী হয়, তা হলেও মদনের মাঝে অনেক অনেক লিমিটেশন আছে। টম ক্রুজ, আইনষ্টাইন, বিল গেট্‌স হলেও তো আমরা ঐরকম সৌন্দর্য আশা করতে পারি না! পারি?


সৌন্দর্য

আল্লাহ্‌ কোরানে বলেছেন, তিনি মানুষকে অনেক সুন্দর গঠনে তৈরী করেছেন। কিন্তু আমি কিসেকে সৌন্দর্য হিসেবে ধরব? মানুষ মন এবং শরীর মিলিয়েই সুন্দর। শুধু শরীর দিয়ে সৌন্দর্যের বিচার করলে মানুষকে অপমান করা হয়। কিন্তু মদনের মত মানুষের সংখ্যাই বেশী বাংলাদেশে। তাই আমিও যদি ধরে নিই, সৌন্দর্য শুধু শারীরিক, তাও কিভাবে সৌন্দর্যের স্ট্যান্ডার্ড ধরব? জাপানীরা জাপানিদের কাছে সুন্দর; আমি জাপানে থাকি বলে জাপানিদের আমার কাছেও সুন্দর লাগে, কিন্তু দেশে থাকতে লাগত না। আর আমাদের দেশের মানুষের কাছে জাপানী হলে, তা সে যতই সুন্দর হোক না কেন, সুন্দর লাগে না। তাহলে? আমি অনেক ভেবেছি, অনেক! সমাধানের জন্য।


একদিন ট্রেনে বসে আছি, হুট করে সমাধানটা মাথায় চলে আসল। ট্রেনে একটা নিগ্রো কাল মেয়ে দেখেছিলা, ২৮-২৯ বয়স হবে হয়তো। কিন্তু কেন জানি, আমার কাছে মনে হল, আরে মেয়েটা তো সুন্দর। নিজেই আশ্চর্য হয়েছি, এরকম মনে হওয়ার কারণে। আমি জানি, মূর্খরা হাসতেছে আমার কথা শুনে। কিন্তু ওরে মূর্খ, মানুষ দূরে থাকুক, একটা গাছের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে দেখো, মুখ থেকে এমনিতেই বের হয়ে যাবে, ও আল্লাহ্‌, তুমি মহান!


আমার মতে প্রত্যেকটা মানুষ, তা সে যে দেশেরই হোক, যেরকম গায়ের রঙই হোক, যেরকম চোখই হোক, যেরকম চুলই হোক, আল্লাহ্‌ তাকে যা দিয়েছেন, তাতে সে সুন্দর। সে কালো হোক, জাপানি হোক, বাংলাদেশী হোক, সাদা হোক। একটা ঊদাহরণ দিই, যদি কেউ কোন মানুষকে তার উচ্চতার জন্য, তার গায়ের রঙ এর জন্য, তার নাক, চোখ এর জন্য অসুন্দর বলে তাহলে সেইতা হচ্ছে অমানবিকতা। এবং আল্লাহ্‌কে অপমান করা। কিন্তু সে যদি নিজে নিজের যত্ন না নেয়, বা নিজেকে নিজে অসুন্দর বানায়, তাহলে তাকে অসুন্দর বলা যায়। যেমন, আল্লাহ্‌ তাকে যে চুল দিয়েছেন তার যত্ন নিলে হয়তো চুল ভাল থাকতো, তখন কেউ তাকে চুলেত জন্য আসুন্দর বলতে পারে। কিংবা কোন মানুষ যদি নিজে মোটা হয়ে যায়, তাহলে মোটার জন্য মানুষ তাকে অসুন্দর বলতে পারে। এককথায়, যা আল্লাহ্‌র দেয়া, যাতে মানুষের হাত ছিল না, তাতে প্রত্যেক মানুষ সুন্দর। কিন্তু যাতে তার হাত ছিল, কিন্তু সে নিজের সৌন্দর্য নিজে নষ্ট করেছে, তাহলে তাকে অসুন্দর বলা যায় হয়তো, যেমন সে যদি ভূড়ি বানায়, তাহলে সে অসুন্দর। আমার এই থিয়োরী ওইদিনই ট্রেনে বসে বসে পুরো করি নাই। আজকে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, কেন ঐদিন ট্রেনে ওই কালো মেয়েটাকে আমার সুন্দর লেগেছিল। কারণ, আল্লাহ্‌ তাকে যা দিয়েছিলেন সে তার যত্ন নিয়েছিল, নিজের সৌন্দর্য নিজের হাতে নষ্ট করে নাই। ঐদিন কালো মেয়েকে সুন্দর মনে হওয়াতে অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর হই না!




জীবরাইলঃ আচ্ছা মদন, মেয়ে ফর্সা না হলে চলবেই না লিখেছ। কেন?

মদনঃ কেন আবার কি? ফর্সা ছাড়া বিয়ে করা যায় নাকি!

জীবরাইলঃ মদন, আমি যতদুর জানি, তুমি র‌্যাসিজমে বিশ্বাস করো না এবং র‌্যাসিজম ঘৃণা কর।

মদনঃ হ্যাঁ, করি।

জীবরাইলঃ তাহলে তুমি যা করছ, তা কি? ওয়েষ্টার্ণরা করলে তাও কিছুটা হয়তো মানায়। কারণ, ওদের গায়ের রঙ সাদার মত ফর্সা, আর নিগ্রদের কালো। কিন্তু বাংলাদেশী ফর্সা,শ্যামলা আর কালোর মাঝে তো ১৮, ১৯ আর ২০ এর তফাৎ। তাহলে কি তোমাকে ওয়েশটার্ণদের চেয়ে অনেক বেশী র‌্যাসিষ্ট মনে হয় না?

মদনঃ ধুর, বেশী বক। যাই হোক আমার ফর্সা বৌ লাগবেই।

জীবরাইলঃ তুমি যেটা বিশ্বাস করো যে ঠিক না, অথচ নিজের বেলায় সেইটাই করো? কি ধরণের ব্যক্তিত্ত্ব তোমার? তোমার তো পার্সোনালিটিই নেই!

মদনঃউম্‌ম্‌


জীবরাইলঃ মদন, তুমি বলেছ, তোমার সাথে মেয়ের বয়সের পার্থক্য ৫ বছর হলে পারফেক্ট। কেন?

মদনঃ মদন, কেন মানে? এইটা তো সবায়ই জানে। আর ৫ বছর গ্যাপ হলে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভাল হয়।

জীবরাইলঃ কেন ভাল হয়, একটু বুঝিয়ে বলবে?

মদনঃ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভাল হয়, সবাই জানে।

জীবরাইলঃ সবাই জানে বুঝলাম, কিন্তু কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, কোন শক্ত যুক্তি, কোন মেডিকেল বা বায়োলিজিক্যাল প্রমাণ, কোরানের কোন বেইজএরকম কিছু আছে এর পিছনে?

মদনঃ না, তা মনে হয় নাই।

জীবরাইলঃ তাহলে, কেন বলছ?


৩ থেকে ৫ বছরের গ্যাপ

বিশ্বাস কর, এই গ্যাপের ধারনার পিছনে কোন যুক্তি নাই। মানুষের শুধু মনে হয়, যে এই গ্যাপ থাকা আবশ্যক। নিজের ফ্যামিলীর দিকেই তাকিয়ে দেখো, নিজের বাবা মায়ের বয়সের গ্যাপ দেখো, নিজের বোন-দুলাভাই এর গ্যাপ দেখো, নিজের খালা-খালু, মাম-মামী এদের বয়সের গ্যাপ দেখোআমার মনে হয় না, খুব বড় কোন সমস্যা হয়। যদি হয়ও, তাও অন্য কোন কারনে হয়তো। ঐ ৩ বছর কিংবা ৫ বছরের গ্যাপের ধারণাটা কেন তাহলে?


বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে নেক আগে, ছোট বোনের বিয়ে দিয়ে নিই আগে

দুনিয়াতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যেখানে বড় ভাইয়ের আগে ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে, বড় বোনের আগে ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে; কোনদিনই দুনিয়ার কিছু উল্টিয়ে যায় নি। সবই ঠিকমত চলে এসেছে। তাহলে মানুষেরা কেন একথা বলে বড় ভাইয়ের বিয়ে আগে হোক? কেন বলে? কার ভয়ে এই কথা বলে? মানুষের কথার ভয়ে? ওরে পাগল, মানুষের কথাকে ভয়, যেখানে আল্লাহ্‌ কোন বাধা দেন নাই। কাউকে যদি জিজ্ঞেস করি, কেন, বড় ভাইয়ের আগে ছোট ভাইয়ের বিয়ে দেয়া যাবে না? উত্তরে শোনা যায়, কেমন দেখায়, কিংবা লোকে কি ভাববে, কিংবা কেউ করে নাকি এমন, কিংবা বড় ভাই কষ্ট পাবে। হাস্যকর! আসলেই হাস্যকর সব কারণ। সত্যি বলছি, সব ছেলে এবং মেয়েকে, বুকে হাত দিয়ে বলুন, ছেলে হয়ে মেয়ের সান্নিধ্য পেতে যারা দেরী করেন, কিংবা মেয়ে হয়ে ছেলের সান্নিধ্য পেতে যারা দেরী করেন; আবারো বলছি বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনারা কি সুখী। ও আল্লাহ্‌, এরা কবে বুঝবে, শয়তানের ধোঁকা খুব দুর্বল! বুকে হাত দিয়ে বলুন, কোন মেয়ের ভালবাসা, মনোযোগ, সান্নিধ্য না পেয়ে বুক হাহাকার করে না? বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনি নিজেকে শারীরিক ভাবে নিজেই নিজের ক্ষতি করেন না? নিজের মনকে নিজেই oppress করেন না? হ্যাঁ বিয়ে না করেও হয়তো এসব পাওয়া যায়, কিন্তু ব্যভিচার করলে আর তো বলার কিছু থাকে না। তাহলে কেন এসব খোঁড়া যুক্তি দিয়ে নিজেকে নিজে প্রতারণা করেন?


জীবরাইলঃ মদন, তুমি তো দেখছি, মেয়ের সাথে সাথে মেয়ের ফ্যামিলীর ব্যাপারেও ডিমান্ড করেছ?

মদনঃ হ্যাঁ। জানোই তো জীবরাইল, আমাদের দেশে বিয়ে শুধু ছেলে-মেয়ের মাঝে হয় না, ফ্যামিলীও দরকার।

জীবরাইলঃ না ঠিক আছে বুঝলাম। কিন্তু মেয়ের চাচা, মামা, খালা এদের দিয়ে তুমি কি করবা?

মদনঃ আমি যখন এদের বাসায় বেড়াতে যাব, বা সমাজে উঠতে বসতে হবে না, এদের সাথে?

জীবরাইলঃ কিন্তু একদম সবার অবস্থা তো ভাল হয় না। সবাই তো established হয় না। আর এদের সাথে দেখা হবে বছরের ২/১ দিন তোমার। আর এরা যেমনই হোক, তার সাথে তোমার সুখী হওয়ার না হওয়ার কি আছে?

মদনঃ জীবরাইল, তুমি আসলেই একটা মদন। তুমি এসব বুঝবা না। তুমি তো আর মানুষ না, তাই তোমার মানুষ কি বলবে তা ভাবতে হয় না।


পাছে লোকে কিছু বলে

করিতে পারিনা কাজ, সদা ভয় সদা লাজ.পাছে লোকে কিছু বলে। মানুষখুবই আজীব। সে শুধু অন্য লোকের কথা ভাবে যে সে এই কাজটা করলে তার সম্পর্কে লোকে কি ভাববে? হায়, হায়, আমরা এত পরাধীন। একদম নিজের মনের কাছে নিজে বন্দী! সেই লোকদের কথা ভাবছি, যারা বিপদের দিনে সামান্যতম সাহায্য করবে না। অথচ নিজের কথাই নিজে ভাবছি না। পাছে লোকে কিছু ভাবেএই জিনিসটা কেবল বিয়ে না, আমাদের পড়াশোনা, আমাদের কাজ, আমার কথা আমাদের উন্নয়ন সব কিছুর ভিতর এক অনেক বড় শিকল। যেই দিন এই শীকল থেকে বের হতে পারব না, আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস আমরা সামনে এগুতে পারবো না। একটা বৃত্তের ভিতরই ঘুরপাক খাবো।

Tuesday, December 23, 2008

অনুসরণ

মাসুদ রানা
সুকুবা, জাপান
২৩ ডিসেম্বর, ২০০৮


অনুসরণ

যখন কোন মা তার ছেলেকে পাড়ার অপর এক ভাল ছাত্রকে দেখিয়ে তার নিজের ছেলেকে তার মত হতে বলে তখন মা আসলে ছেলেকে কি বলতে চায়? বলতে চায় যে, ঐ ছেলের পড়াশোনার জন্য যে চেষ্টা করে সেরকম করতে । মা কিন্তু কখনও বলতে চায় না, ঐ ভাল ছাত্র কিভাবে হাঁটে, কিরকম পোষাক পরে এসব জিনিস মানার কথা । কোন ফিজিসিষ্ট যখন আইনষ্টাইনকে অনুসরণ করে, তখন সে আইনষ্টাইন এর থিয়োরী, আইনষ্টাইন এর বিশ্বাস মানার চেষ্টা করে, আইনষ্টাইনের মত গবেষণা করার চেষ্টা করে, আইনষ্টাইনের মত পরিশ্রম করার চেষ্টা করে । সেই ফিজিসিষ্ট কিন্তু আইনষ্টাইনের মত ঝাকড়া চুল রাখে না, আইনষ্টাইনের মত কাপড়-চোপরের প্রতি অবহেলা করে না।



রাসুল মুহাম্মদ কে আল্লাহ্‌ কোরানে বেষ্ট উদাহরণ হিসেবে সার্টিফাইড করেছেন । সুতরাং, আমরা তাকে অনুসরণ করব । আমরা বলতে আমি মুসলমানদের কথা শুধু বুঝাচ্ছি না, যে কোন ধর্মের মানুষ তাকে অনুসরণ করার অধিকার রাখে । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমরা সবসময় সুন্নত জ্বরে ভুগে থাকি । উপরে ভাল ছাত্র আর আইনষ্টাইনের যে উদাহরণ দিলাম তাতে এবং আমাদের অন্তসারশূণ্য মুসলমান সমাজের কথা জানে এমন লোক ইতিমধ্যে বুঝে গেছে আমি আসলে কি বলতে চাচ্ছি । তারপরেও কিছু জিনিস আলোচনা করব ।


আমরা একটা জিনিস বোধ হয় ভুল করি । রাসুলুল্লাহ্‌ রাসুল হয়েছিলেন নিজের যোগ্যতায় । আমি ব্যখ্যার সুবিধার জন্য ধরে নিই, যে ইসলামে নামায, রোযা আর হজ্জ্ব এই তিনটা জিনিস নেই । নামায, রোযা আর হজ্জ্ব দেখে তো রাসুলুল্লাহ্‌র আমলে কেউ মুসলমান হয়নি, তাই না ? আপাতত মনে করি নামায, রোযা আর হজ্জ্ব নেই ইসলামে ।


এবার কোন মুসলমানকে কোন এক অমুসলিম বলল যে, হুম্‌ম্‌, তুমি তো মুসলমান, এবং তোমার কোরান মতেই মুহাম্মদকে তোমাদের অনুসরণ করা উচিৎ; কি কি কর তুমি ? কি উত্তর দিবে সে ? বিশ্বাস করুন, রাসুলুল্লাহ্‌র পোষাক, টুপি আর নামায, রোযা, হজ্জ্ব বাদ দিলে, উত্তর নাই বুকে হাত দিয়ে কয়জন এর উত্তর দিতে পারবে ? নামায করলেই সব হয়, এমন কথা অন্তত বলবেন না ; নিশ্চয়ই, ক্লাশ ফাইভের বাচ্চা ছেলেও হাসবে ঐসব মূর্খের মত কথা শুনলে ।


রাসুলুল্লাহ্‌ কখনও মিথ্যা কথা বলেননি, আমরা পারি তাকে অনুসরণ করতে ? উনি ক্রোধের বশবর্তী ছিলেন না, ক্রোধ তো আমাদেরকে খেয়ে ফেলছে । উনি পরিশ্রমী ছিলেন, কোন কাজকে ঘৃণা করতেন না, উনি অহংকারী ছিলেন না । একটা উদাহরণ দিই, একদিন ঘরে খাবার ছিল না বলে, উনি এক ইহুদীর কূপের পানি তুলতে গিয়েছিলেন । উনি ভাবেন নাই উনার বংশ গৌরবের কথা, উনি পানি তোলাকে ছোট কাজ মনে করেন নি । এবং ঐ ইহুদী লোকটি তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছিল, উনি ক্রোধের বশবর্তী হন নি ।


রাসুলুল্লাহ্‌ পরনিন্দা করতেন না, মানুষের কথা মানুষের কাছে গিয়ে লাগাতেন না । ঘুষ, সুদ খেতেন না । স্ত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না । চুরি করতেন না । মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না । হীন এবং ছোট মনের ছিলেন না উনি । কথা দিয়ে কথা রাখতেন, ৫টা বলে ৮টায় অনুষ্ঠান শুরু করার মত লোক উনি ছিলেন বলে মনে হয় না । উনি হতাশাবাদী ছিলেন না, উনি কখনও বলেন নি, এই দেশকে দিয়ে কি হবে ?


উনি জ্ঞানী ছিলেন, হয়তো বই পড়েননি, কিন্তু তাই বলে জ্ঞান অর্জন করেননি তা নয় । অবশ্যি উনি প্রচুর ভাবতেন, তা হলে কেন উনি প্রতি বছর গুহায় যেতেন শুধু ভাবার জন্য । আর আমরা ? হায় আল্লাহ্‌, মাথার ব্যবহার কিছুই করি না । আল্লাহ্‌কে অপমান করার এর চেয়ে খারাপ উপায় আর কি থাকতে পারে ?


আমাকে বলুন, কি উত্তর আমি দিব; যদি আমাকে কোন অমুসলমান জিজ্ঞেস করে আমি রাসুলুল্লাহ্‌কে অনুসরণ করি কিনা ? কী, দিতে পারব উত্তর ? বলতে পারব, আমরা বাংলাদেশীরা ৮৫% মানুষ রাসুলুল্লাহ্‌কে অনুসরণ করি । লজ্জা করে যখন, বইয়ে পড়ি বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বড় মুসলিম দেশ । বাংলাদেশের ৮৫% মানুষ মুসলমান, হায়, এর চেয়ে বড় রসিকতা আর কি হতে পারে ? কোন এক ভিন গ্রহ থেকে যদি কোন প্রাণী পৃথিবীতে আসে, এবং তাদের যদি ইসলাম এবং এর বেষ্ট ঊদাহরণ রাসুলুল্লাহ্‌ সম্পর্কে জানিয়ে বলা হয়, খুঁজে বের কর তো এদের এদের ঘনত্ব কোথায় বেশী, আমার মনে হয় না বাংলাদেশ হবে সেই জায়গা; বরঞ্চ জাপান বেশ এগিয়ে থাকবে বলে মনে হয় । হ্যাঁ, জাপান এগিয়ে থাকবে । লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ বললে আর মুসলিম নাম না থাকলে মুসলমান হওয়া যায় না, এই ধারণা যদি পোষণ করেন তাহলে আর কি বলব?


হায়রে মুর্খ মুসলমানেরা নকল করা আর অনুসরণ করা তো এক জিনিস না । আমাদের অবস্থা এখন এমন আমরা একজনের রিপোর্ট পুরোপুরি নকল করে লজ্জা তো পাই ই না, বরঞ্চ বুক ফুলিয়ে সেই কথা প্রচার করি । নামায রোযার মাধ্যমে আমরা রাসুলুল্লাহ্‌কে নকল করি মাত্র, উনাকে অনুসরণ করি না । কাউকে যদি জিজ্ঞেস করি, তোমার বাবা ধার্মিক, তাই না ? উত্তরে সে বলবে, বাবা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন। খুব সম্ভব তার বাবা আসলেই ধার্মিক, কিন্তু পয়েন্ট তা না, পয়েন্ট হচ্ছে শুধু নামায রোযাকেই ধার্মিকতার মানদন্ড হিসেবে ধরে নিই । কী অপমান করি আমরা রাসুলুল্লাহ্‌কে !


হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ্‌কে অনুসরণ করাকেই বলে সুন্নত পালন করা । মরিচীকার মত সওয়াবের লোভ আমাদের জীবনে ভাইরাসের মত প্রবেশ করেছে । চার রাকাত সুন্নত নামায, তা নিয়ে পরে বলছি; কয়েকটা ঊদাহরণ দিব, আমরা নিরেট গবেটের মত কি সুন্নত পালন করি এবং মনে করি আমাদের সওয়াবের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে ।


রোযার দিন ইফতারের সময় খেজুর খেয়ে রোযা ভাঙ্গাকে আমরা সুন্নত এবং সওয়াবের কাজ মনে করি । কারন, রাসুলুল্লাহ্‌ তা করতেন । ওরে মূর্খ, রাসুলুল্লাহ্‌র খাবারের মেন্যুর একটা উপাদান ছিল খেজুর, উনি খেজুর খাবেন না তো কি খাবেন ? আল্লাহ্‌ রাসুলকে পাঠিয়েছেন আমাদের মাঝে জ্ঞান বিতরন করার জন্য, আমার কথা না, কোরানের কথা । কেউ যদি বের করতে পারেন, হ্যাঁ, সারাদিন না খেয়ে থেকে, মিষ্টি জিনিস খাওয়া শরীরের জন্য ভাল, তাহলেও, মিষ্টি জিনিস অনেক আছে, খেজুর কেন? এরকম নকল করার অর্থ কি ? কেন উনি যে পোষাক পরতেন সেই পোষাক পড়তে হবে ? উনি রাসুল ছিলেন, একইসাথে সৌদি ছিলেন, উনি ওইরকম পোষাক পড়বেন, তাই বলে গরমের দেশে হোক, ঠান্ডার দেশে হোক ঐরকম নকল করতে হবে? এর মাঝে শিক্ষার কি আছে ?


আমরা কি নকল করা ছেড়ে উনাকে অনুসরণ করতে পারি না ।


সুন্নত নামায

সুন্নত মানে কি ? পথ । হ্যাঁ রাসুলুল্লাহ্‌ যে পথে চলেছেন তাই ই সুন্নত । সেই পথে চলাটা সুন্নত । উনার উঠা-বসা টাইপের জিনিস নকল করার নাম সুন্নত না । কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় জোহরের নামায, উত্তর ৪ রাকাত সুন্নত, ৪ রাকাত ফরয, ২ রাকাত সুন্নত । কেন ঐ সুন্নত নামায কেন? কারণ রাসুলুল্লাহ্‌যা সবসময় করতেন তাই সুন্নতে মুয়াক্কাদা, মানে পালন না করলে গুনাহ্‌ হবে । আমি জানি না, এই ধারণা কার মাথা থেকে প্রথম এসেছে । রাসুলুল্লাহ্‌ সবসময় যা করতেন, তাই যদি সুন্নত হবে তাহলে ঐ একই কথা বলতে হয়, উনি সারাজীবন ধরে নিজের চরিত্র গঠন করেছেন । ঐটাই কি সুন্নত না ? আমি মোটেও জ্ঞানী নই, শুধু মাঝে মাঝে একটু চিন্তা করতে ভালবাসি । রাসুলুল্লাহ্‌ সবসময় যা করতেন, তাই যদি সুন্নতে মুয়াক্কাদা হয়, তাহলে কেন তাহাজ্জুদ নামায সুন্নতে মুয়াক্কাদা না? ঐটা করা কঠিন বলে ? আল্লাহ্‌ নিজে তাহাজ্জুদ নামাযকে অনেক পছন্দ করেন । কিন্তু ঐটা নফল? কখনও মন থেকে ইচ্ছা হয় আমাদের যে, ফরয এর চেয়ে বেশী নামায পড়ি । নামায কি? সহজ কথায় আল্লাহ্‌র সাথে দেখা করতে যাওয়া, আল্লাহ্‌র সাথে কথা বলা । কখনও মনে হয়, আমার আল্লাহ্‌র সাথে আরো বেশী কথা বলা দরকার? এবং তখন ফরযের বাইরেও নামায পড়ার কথা ? আমরা তো বেশীরভাগ সময় পাপের ভয়ে সুন্নত পড়ি । হায় কি অজ্ঞতা ! এইসব নিয়ম-কানুন আমাদের কাছে হাতে পায়ে শিকলের মত হয়ে গিয়েছে । আমরা হয়ে গিয়েছি শপিং সেন্টারের পুতুলের মত । শরীর আছে, পোষাক আছে, আত্মা নাই । আমাদের নামায রোযা ঐ পুতুলের মতই ।


রোযা

যারা এই লেখা পড়ছেন, তারা নিজের কাছেই প্রশ্ন করবেন প্লীজ । আমরা কী রোযা রাখি ? আবারো সেই একই কথা । কোন এলিয়েনকে রোযার মাসে বাংলাদেশে এনে যদি বলা হয়, দেখো,এই জাতিটা সংযম পালন করছে, মানে রোযা রাখছে । আমার পুরো বিশ্বাস সেই এলিয়েন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠবে ।


আমাকে হতাশাবাদী মনে করবেন না । আমি তা নই । আমাকেও এও বলবেন না, এইসব তো পুরাতন কথা, সবাই জানি ।E-mc2আমরা সবাই জানি । তাই বলে কি তার অর্থ আমরা সবাই বুঝি ? একই জিনিস শুধু ইনফরমেশনটা জানাকে জানা বলে আমার মনে হয় না ।


এই লেখার সাথে সম্পর্ক আছে বলেই আমি ডা, লুৎফর রহমানের প্রবন্ধ সমগ্র থেকে কিছু কোটেশন দিচ্ছে । আশা করি, চিন্তার খোরাক পাবেন । মহৎ জীবন এ উনি বলেছেন,

তুমি যে জাতিই হও না, ভিন্ন জাতির প্রতি তোমাকে অভদ্র হতে হবে কেন? তোমার মনুষ্যত্ব, তোমার জ্ঞান দেখেই মানুষ তোমার ধর্ম ও সমাজকে সম্মানের চোখে দেখবে ।


হযরত মোহাম্মদ(স) যে এত মানুষকে মুসলমান করেছিলেন, সে কীসের বলে ? তাঁর মনুষ্যত্ব, তাঁর আশ্চর্য ভদ্রতা মানুষের মনকে মুগ্ধ করে দিত । বস্তুত হযরত মোহাম্মদের(স) জীবনে তাঁর ভদ্রতা ছিল আশ্চর্য জিনিস । তাঁর স্নেহ, তাঁর সহনগুণ, তাঁর স্বভাবের অনন্ত মাধুরী মানুষকে পাগল করে দিত ।


উচ্চ জীবন এ ডা। লুৎফর রহমান বলেছেন,

হযরত মুহম্মদ(স) পতিত, পাপান্ধ, অনুভুতিহীন মানুষের জীবন দেখে অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন । তিনি ভেবেছিলেন সোনার মানব জীবন কেন এত পাপে কলঙ্কিত হবে ? মানুষের পাপ তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল ।


তিনি তাঁর শিষ্যমন্ডলীকে ভালবাসেন, শেষ দিনে তিনি মানব নাম উচ্চারণ করবেন এই কথা বলেই আমরা যদি তৃপ্তি লাভ করি, তা হলে আমরা অপদার্থ । তিনি আমাদের পাপ ও অন্ধতা দেখে কেঁদে দিয়েছিলেন সে কথা আমাদের স্মরণ নেই, আমরা কেবল তাঁর দয়ার মহিমা প্রচার করি । কী বিড়ম্বনা, বিবেক ও চিন্তাহীন জাতির পতন কি আশ্চর্যভাবে সংঘটিত হয় ।


সহজ কথা, আল্লাহ্‌র রিকমেন্ডেশন অনুসরণ করলে অর্থনৈতিক, সামাজিক, আত্মিক, জ্ঞান-বৈজ্ঞানিক সব দিক দিয়ে মুসলমানদের উপরে থাকার কথা । যেকোন জিনিসের আউটপুট থেকেই বোঝা যায়, তার ইনপুট আর ব্লাক বক্স কেমন । আমাদের নিজেদের আউটপুট দেখে কি আমাদের আরেকবার শুরু থেকে চিন্তা করা উচিৎ না, আমরা কি করছি ?


আমার যেকোন ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।

Friday, July 25, 2008

কুর্‌আন এবং আধুনিক বিজ্ঞান - সুসঙ্গত নাকি অসঙ্গত [প্রথম অর্ধাংশ]

THE QUR’AN & MODERN SCIENCE

COMPATIABE OR INCOMPATIABLE

Authored by Dr. Zakir Abdul Karim Naik


কুর্‌আন এবং আধুনিক বিজ্ঞান সুসঙ্গত নাকি অসঙ্গত

অনুবাদঃ মাসুদ রানা


ভূমিকা

পৃথিবীতে মানব জন্মের শুরু থেকেই মানুষ সবসময় প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করে এসেছে। জীবনের উদ্দেশ্য এবং এই সৃষ্টিজগতে নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করেছে। এই সত্যের সন্ধানে, বহু শতাব্দী এবং শত শত সভ্যতা পার করে সুশৃঙ্খলিত জীবন ব্যবস্থা (ধর্ম) মানুষের জীবনকে বহুলাংশে সুগঠিত করেছে এবং ইতিহাস রচনা করেছে। কিছু কিছু জীবন ব্যবস্থা (ধর্ম) আছে, যা সেগুলোর অনুসারীদের মতে তা হচ্ছে লিখিত দলিলেরভিত্তিক; আর কিছু কিছু জীবন ব্যবস্থা (ধর্ম) আছে, যেগুলো মানুষের জ়ীবনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক।


মুসলিমদের (আত্নসমর্পণকারী) মতে আল-কোরান (ইসলামী বিশ্বাসের মূল উৎস) হচ্ছে পুরোপুরি ঐশ্বরিক। মুসলিমরা আরও বিশ্বাস করে যে, এটি (কোরান) হচ্ছে সমস্ত মানবজাতি (শুধু মুসলমান নয়) -র জন্য পথ নির্দেশক। যেহেতু কোরানের বার্তা সব যুগের জন্য প্রেরিত , সেই অর্থে কোরানকে সব যুগের জন্যই উপোযোগী হতে হবে। কিন্তু কোরান কি আসলেই এই পরীক্ষায় ঊত্তীর্ণ হতে পারবে?


এই বইয়ে আমি কোরানের ঐশ্বরিক সোর্স সম্পর্কে মুসলিমদের বিশ্বাস, বিশেষ করে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আলোকে বিশ্লেষণ করতে চাই।


সভ্যতার এক সময় ছিল, যখন মিরাকল বা যা মিরাকল বলে মনে করা হত, সেসব বিসয় মানুষের যথাযোগ্য কারণ ও যোক্তিকতার উপরে স্থান পেত। অবশ্যই, মিরাকল বলতে বুঝাত, যা দৈনন্দিন জীবনে ঘটে না এমন সব জিনিস কিংবা যার ব্যখ্যা নেই।


কিন্তু, কোন একটা জিনিসকে মিরাকল হিসেবে গ্রহণ করার ব্যপারে আমদেরকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। ১৯৯৩ সালে The Times of India, Mumbai একটি রিপোর্টে প্রকাশ করে যে, বাবা পাইলট নামের এক ঋষি টানা ৩ দিন ট্যাংকের পানির নিচে ডুব দিয়ে ছিলেন। কিন্তু যখন রিপোর্টারেরা তার এই মিরাকলের কৌশল জানার জন্য ট্যাংকের তলা পরীক্ষা করতে চাইলেন, তখন সেই ঋষির আপত্তি উঠলো। সে যুক্তি-তর্ক উত্থাপন করল, কিভাবে কেউ মায়ের গর্ভের ভিতরের জিনিস পরীক্ষা করতে পারে। নিশ্চিত যে, সেই ঋষি কোন কিছু লুকাচ্ছিল! তার ঐ পানিতে ৩ দিন ডুব দিয়ে থাকতে পারার দাবীটা ছিল জনপ্রিয়তা পাবার জন্য একটা ধোঁকা মাত্র। সামান্যতম সুস্থ চিন্তাধারার মানুষ এই ধরনের মিরাকল মেনে নিতে পারবে না। এই ধরনের মিথ্যা মিরাকল যদি আসলেই ঐশ্বরিক হয়ে থাকে, তাহলে, পৃথিবীর সকল বিখ্যাত যাদুকর (যারা অবিশ্বাশ্য সব ম্যাজিক দেখায়) -ই একেকজন ঐশ্বরিক দেবতা।


কোন একটা বই যদি ঐশ্বরিক দাবী করে, তাহলে সেটা আসলে নিজে যে একটা মিরাকল তার দাবীই প্রকাশ করে। এই ধরণের কোন দাবী সেযুগে বিশ্বাসযোগ্য কোন একটা স্টান্ডার্ড বা পরিমাপক দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা যায়। মুসলিমরা বিশ্বাস করে যে, কোরান হচ্ছে আল্লহ্‌র সর্বশেষ ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ বা আবির্ভূত বার্তা। মুসলিমরা এও বিশ্বাস করে যে, এই কোরান হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ মিরাকল। এবং এই কোরান সমস্ত মানবজাতির পথ প্রদর্শণকারী প্রত্যাদেশ। কোরান সম্পর্কে মুসলিমদের এই বিশ্বাস কতটুকু নির্ভরযোগ্য, তা ভেরিফাই বা প্রতিপাদন করে দেখা যাক।


কোরানের চ্যালেঞ্জ

সাহিত্য এবং পদ্য সব যুগেই মানুষের অনুভূতি প্রকাশের এবং সৃষ্টিশীলতার মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয়ে এসেছে। বর্তমান যুগে পৃথিবীর মানুষ যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে গর্ব করে, তেমনি এমন যুগ ছিল, যখন মানুষ সাহিত্য ও পদ্য নিয়ে মানুষ গর্ব করত।


এমনকি অমুসলীমরাও স্বীকার করে যে, আরবী সাহিত্যে কোরান এর অবস্থান হচ্ছে সবার উপরে -- সর্বশ্রেষ্ঠ। কোরান সমস্ত মানব্জাতিকে এরই মত একটা বই লিখে দেখানোর ব্যপারে চ্যালঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।


আমি আমার দাসের প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মত কোন সুরা আনো । আর তোমরা যদি সত্য বল, আল্লাহ্‌ ছাড়া তোমাদের সব সাক্ষীকে ডাকো ।

যদি না কর, আর তা কখনও করতে পারবে না, তবে সেই আগুনকে ভয় করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, অবিশ্বাসীদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে ।

And if ye are in doubt as to what We have revealed fom time to time to Our servant, then produce a Surah like thereunto; and call your witnesses or helpers (if there are any) besides Allah, if your (doubts) are true.

But if ye cannot – and of a surely you cannot – then fear the Fire whose fuel is Men and Stones – which is prepared for those who reject faith.

[আল-কোরান ২; ২৩ - ২৪]


কোরানের চ্যলেঞ্জ হচ্ছে, কোরানে যে সুরা (চ্যাপ্টার) গুলো আছে তার মত একটি সুরা তৈরী করে দেখানো । এই একই চ্যলেঞ্জ কোরানে আরও কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে । চ্যলেঞ্জটি হলো, কোরানের যেকোন একটি সুরার মত একটি সুরা তৈরী করে দেখানো যা হবে কোরানের সুরাগুলোর মতই সুন্দর, অলঙ্কারপূর্ণ, গভীর অর্থপূর্ণ ।


কবিতার ছন্দে যতই চমত্‌কার হোক না কেন, বর্তমান যুগের কোন বুদ্ধিজ্ঞানসম্পর্ণ মানুষ কোন ধর্মীয় ধারণা গ্রহণ করবে না যদি সেই ধর্মীয় বই বলে যে, পৃথিবী হচ্ছে সমতল । কারণ, আমরা এমন একটা যুগে বাস করছি যেখানে যৌক্তিকতা আর বিজ্ঞানকে প্রাধাণ্য দেয়া হয় । কুরআনের ভাষা যতই চমত্‌কার হোক না কেন, খুব কম লোকই কুরআনকে গ্রহণ করবে যদি কুরআনে যৌক্তিকতা আর বিজ্ঞান না থাকে । কোন বই তখনই ঐশ্বরিক উত্‌স হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে, যখন সেটা নিজস্ব যুক্তিতে শক্তিশালী হবে ।


নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু, আর বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ । এখন, কুরানকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক যে, কুরান কি আসলেই আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমান তালে চলতে পারে কিনা ।


কুরান কোন বিজ্ঞানের বই নয়, বরঞ্চ এটা হচ্ছে নিদর্শনের(আয়াত) বই । কুরানে ছয় হাজারের বেশী নিদর্শন আছে যার মাঝে এক হাজারের বেশী আয়াত পরিশুদ্ধ বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলেছে ।


২ মহাকাশবিদ্যা

মহাবিশ্বের সৃষ্টি বিগ ব্যাংগ

মহাকাশবিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের সৃষ্টিকে বিখ্যাত বিগ ব্যাংগ এর ঘটনা দিয়ে ব্যখ্যা করে থাকেন । বিগ ব্যাংগ এর ঘটনা বহুদিনের ডাটা আর পর্যবেক্ষণ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়েছে । বিগ ব্যাংগ এর মতে সমস্ত মহাবিশ্বটা শুরুতে ছিল একটিমাত্র ভর(Primary Nebula) । তারপর তার থেকে মহাবিস্ফোরণ এর মাধ্যমে গ্যালাক্সীর সৃষ্টি হয়েছে । তারপর গ্যালাক্সী থেকে তারা, গ্রহ, সূর্য, চাঁদ প্রভৃতি । মহাবিশ্বের উত্‌স ছিল ইউনিক এবং হঠাত্‌ করে এই বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাব্যতা ছিল প্রায় শূণ্য ।


মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কুরানে নিছের আয়াতটি বর্ণনা করা হয়েছে ।


অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশ ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল ?

Do no the unbelievers see that the heavens and the earth were joined together (as one unit of Creation), before We clove them asunder ?

কুর্‌আন ২১;৩০


কুরানের এই আয়াতটি এবং বিগ ব্যাংগ এর এই অসাধারণ মিল কোনভাবেই অগ্রাহ্য করা যায় না । ১৪০০ বছর আগে এক মরূভূমিতে এরকম শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সত্য কিভাবে আসতে পারে ?


গ্যালাক্সী সৃষ্টির পূর্বের প্রাথমিক গ্যাসীয় ভর

বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে, মহাবিশ্বের সৃষ্টির পূর্বে মহাবৈশ্বিক পদার্থগুলো প্রাথমিকভাবে গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল । সংক্ষেপে বলতে গেলে, গ্যালাক্সী সৃষ্টির পূর্বে বিশাল গ্যাসীয় পদার্থ বিদ্যমান ছিল । প্রাথমিক মহাবৈশ্বিক পদার্থকে ব্যাখ্যা করতে গেলে, গ্যাসের চেয়ে ধোঁয়া শব্দটা বেশী সঠিক । নিচের আয়াতটিতে কুরান মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থাকে দুখান দিয়ে বর্ণনা করেছে । আর দুখান মানে হচ্ছে ধোঁয়া ।


তারপর তিনি আকাশের দিকে মন দিলেন, আর তা ছিল ধোঁয়ার মতো । তারপর তিনি তাকে (আকাশকে) ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা কি দুজনে স্বেচ্ছায় আসবে, নাকি অনিচ্ছায় ? তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় এলাম ।

“Moreover, He Comprehended in His design the sky, and id had been (as) smoke: He said to it and to the earth: ‘Come ye unwillingly’. They said: ‘We do come (together), in willing obedience’.”

কুর্‌আন ৪১;১১


এবং এই ব্যপারটি বিগ ব্যাংগ এর অবস্থানকে সমর্থন করে । এবং নিশ্চিতভাবে মুহাম্মাদ(স) এর যুগে বিগ ব্যাংগ এর ব্যাপারে কেউ জানত না । তাহলে, এই জ্ঞানের উত্‌স কি হতে পারে ?


পৃথিবীর আকৃতি গোলকীয়

আগেকার দিনের লোকেরা ভাবত যে পৃথিবী সমতল । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ খুব দূরে যেত না এই ভয়ে যে, যদি তারা এই সমতল ভূমির শেষ প্রান্ত দিয়ে নিচে পড়ে যায় । স্যার ফ্রান্সিস ড্রাক ১৫৯৭ সালে সমুদ্রভ্রমণকালে প্রথম প্রমাণ করেন যে, পৃথিবী গোলাকৃতির ।


দিন রাত্রির পরিবর্তনের বিষয়ে কুরানের নিচের আয়াতটি বিবেচনা করে দেখা যাক ।


তুমি কি দেখ না, আল্লাহ্‌ রাত্রিকে দিনে ও দিনকে রাত্রিকে পরিবর্তন করেন ?

Seest thou not that Allah merges Night into Day and he merges Day into Night ?

[কুর্‌আন, ৩১;২৯]


এই অংশটুকুর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্‌ রাত ধীরে এবং ক্রমান্বয়ে দিনে এবং দিন ক্রমান্বয়ে রাতে পরিবর্তন হয় । এই ব্যাপারটি কেবল তখনই ঘটতে পারে যখন পৃথিবী গোলাকৃতির হয় । যদি পৃথিবী সমতল হত, তাহলে দিন-রাতের পরিবর্তন হঠাৎ করে হত ।


নিচের আয়াতটিও পৃথিবীর গোলাকৃতির বিষয়ে পরোক্ষভাবে নির্দেশ করে ।


তিনি সুপরিকল্পিতভাবে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন । তিনি রাত্রি দিয়ে দিনকে ও দিন দিয়ে রাত্রিকে ঢেকে রাখেন ।

He created the heavens and the earth in true (proportions): He makes the Night overlap the Day, and the Day overlap the Night.

কুর্‌আন ৩৯;৫


এইখানে যেই আরবী শব্দ কাওওয়ারা ব্যবহার করা হয়েছে তার অর্থ ইংরেজীতে বলা হলে তা হবে “to overlap” or “to coil” । জিনিসটা ঠিক ঐরকম, যেভাবে পাগড়ী মাথার চারপাশে ঘুরিয়ে বাধা হয় । overlapping or coiling তখনই ঘটতে পারে যদি পৃথিবীটা গোলাকৃতির হয় ।


পৃথিবী পুরোপুরি বলের গোলাকার না, মেরুর দিকে কিছুটা চাপা । নিচের আয়াতটি পৃথিবীর সত্যিকারের আকৃতি সম্পর্কে বলে ।


“And the earth, moreover, hath He made egg shaped.”


এইখানে যে আরবী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হল দাহাআহাআ যার অর্থ ostrich egg। এবং ostrich egg ঠিক পৃথিবীর আকৃতির মত ।


চাঁদের আলো প্রতিফলিত আলো

আগে বিশ্বাস করা হত যে, চাঁদের আলো হচ্ছে নিজস্ব আলো । কিন্তু বিজ্ঞান আজ আমাদের বলে যে, চাঁদের আলো হচ্ছে প্রতিফলিত আলো । ঠিক এই বিষয়টিই কুর্‌আনে ১৪০০ বছর আগে উল্লেখ করা হয়েছে ।


কত মহান তিনি যিনি আকাশে বুরুজ(রাশিচক্র) সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানে স্থাপন করেছেন এক প্রদীপ্ত সূর্য ও জ্যোতির্ময় চন্দ্র ।

Blessed is He made Constellationsin the skies, and placed therein a Lamp and a Moon giving light.

কুর্‌আন ২৫;৬১


সূর্যের জন্যে কুরআনে যে আরবী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হল শাম্‌শ । এটা সিরাজ শব্দকেও রেফার করে যার অর্থ টর্চশাম্‌শ ওয়াহ্‌হাআজকেও নির্দেশ করে যার মানে হচ্ছে “blazing lamp”। অথবা এটা দিয়া শব্দকেও রেফার করে যার অর্থ “shining glory” এই তিনটিই শব্দই সূর্যের বর্ণনায় পুরোপুরি ঠিক যেহেতু এদের প্রতিটিই অভ্যন্তরীন দহনের ফলে আলোর সৃষ্টি করে থাকে । চাঁদের জন্যে যে আরবী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা হল কামার এবং এই কামার-কে কুর্‌আনে মুনীর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে । আর মুনীর হচ্ছে সেই জিনিস যা আলো প্রতিফিলিত করে । কুর্‌আনের এই বর্ণনা চাঁদের সত্যিকারের প্রকৃতির সাথে মিলে যায়, কারণ চাঁদের যে আলো তা সূর্য থেকে পাওয়া আলো । কুর্‌আনের কোথাও চাঁদকে সিরাজ, ওয়াহ্‌হাআজ কিংবা দিয়া হিসেবে বর্ননা করা হয়নি । একইভাবে সূর্যকেও কখনোই নূর কিংবা মুনীর হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি । কুর্‌আন এভাবে সুর্য ও চাঁদের আলোর মাঝে পার্থক্য করেছে ।


নিচের আয়াতটি সূর্য ও চাঁদের আলোর প্রকৃতি নির্দেশ করে ।


তিনি সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন

It is He who made the sun to be a shining glory and the moon to be a light (of beauty).

কুর্‌আন ১০,৫


তোমরা কি লক্ষ করনি আল্লাহ্‌ কিভাবে সাত স্তরে সাজানো আকাশ সৃষ্টি করেছেন, আর সেখানে চন্দ্রকে আলো হিসেবে ও সূর্যকে প্রদীপ হিসেবে স্থাপন করেছেন ?

See ye not how Allah has created the seven heavens one above another, And made the moon a light in their midst, and made the sun as a (Glorious) Lamp ?

কুর্‌আন ৭১,১৫-১৬


কুর্‌আন এবং আধুনিক বিজ্ঞান চাঁদের আলোর পার্থক্যের ক্ষেত্রে একই সুরে কথা বলে ।


সুর্যের ঘূর্ণন

দীর্ঘ দিন ধরে ইউরোপিয়ান দার্শনিক ও বিজ্ঞানিরা বিশ্বাস করতেন যে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং সুর্যসহ অন্যান্য নক্ষত্র পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে । পশ্চিমা বিশ্বে টোলেমির সময় (খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী) থেকে পৃথিবীকেন্দ্রিক ধারণা চলে আসছিল । ১৫১২ সালে নিকোলাস কপারনিকাস তার সুর্যকেন্দ্রিক ধারণার প্রবর্তন করেন যেখানে সুর্য স্থির এবং গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশে ঘোরার কথা বলা আছে ।


১৬০৯ সালে জার্মান বিজ্ঞানী জোহান কেপলার “Astronomia Nova” প্রকাশ করেন । শুধু যে গ্রহ সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে তাই নয়, এরা নিজেদের কক্ষের চারপাশেও অনিয়মিত বেগে ঘোরে । এই জ্ঞান থেকে দিন ও রাত্রির পরিবর্তনসহ সৌরজগতের অনেক মেকানিজম ইউরোপিয়ান বিজ্ঞানীদের জন্য সম্ভব হয়ে উঠে ।


এই আবিস্কারের পর এটা ভাবা হত যে, সুর্য স্থির এবং তা পৃথিবীর মত নিজ অক্ষের চারদিকে ঘোরে না । আমি (জাকির নায়েক) নিজেও আমার স্কুল জীবনে এই জিনিস ভূগোল বইয়ে পড়েছি । নিচের আয়াতটি দেখুন


আল্লাহ্‌ই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে । প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে ।

It is He who created the Night and the Day, and the sun and the moon: All (the celestial bodies) swim along, each its rounded course.

কুর্‌আন ২১;৩৩


উপরের আয়াতটিতে ইয়াসবাহুউন নামক আরবী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে । এই শব্দটি কোন গতিশীল বস্তুর বেগের সাথে সম্পর্কিত । যদি এই শব্দটি মাটির উপরে থাকা কোন মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এটা বুঝাবে না যে লোকটি ঘুরছে, বরঞ্চ বুঝাবে যে লোকটি হাঁটছে বা দৌঁড়াচ্ছে । আবার যদি পানিতে থাকা কোন লোকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এতা বুঝাবে না যে লোকটি ভেসে আছে, বরঞ্চ বুঝাবে যে, লোকটি সাঁতার কাটছে ।


একইভাবে যদি ইয়াসবাহ্‌ শব্দটি যদি সূর্যের মত কোন মহাবৈশ্বিক কোন বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় তাহলে এ বুঝাবে না যে সেটা শূণ্যের মাঝ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, বরঞ্চ বুঝাবে যে সেটা ঘুরতে ঘুরতে শূণ্যের মাঝে স্থানান্তরিত হচ্ছে । সুর্য যে নিজ অক্ষের চারপাশে ঘুরে তা এখনকার প্রায় সব স্কুলের বইয়ে লেখা থাকে । সূর্যের নিজ অক্ষের চারপাশে ঘুরার ব্যাপারটি কোন টেবিলের উপর সূর্যের প্রতিবিম্ব দিয়ে প্রমাণ করা যায় । সুর্যের কিছু স্পট আছে যা ২৫ দিনে একবার ঘূর্ণন শেষ করে । অর্থৎ, সুর্য নিজ অক্ষের চারপাশে ২৫ দিনে একবার ঘুরে ।


সূর্য মাহশূণ্যের মধ্য দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ২৪০ কিমি বেগে ধেবে চলছে এবং এর মিলকি ওয়ে গ্যালাক্সীর কেন্দ্রের চারপাশ একবার প্রদক্ষিণ করতে ২০০ মিলিয়ন বছর সময় নেয় ।


সূর্য চন্দ্রের নাগাল পায় না, রাত্রি দিনকে অতিক্রম করে না ও প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটে ।

It is not permitted to the Sun to catch up the Moon, nor can the Night outstrip the Day: Each(just) swims along in (its own) orbit (according to law).

কুর্‌আন ৩৬;৪০


এই আয়াতটি একটি গুরুত্বপুর্ণ সত্যকে নির্দেশ করে যা আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার মাধ্যমে সাম্প্রতিক কালের একটি আবিষ্কার ।


যেই কক্ষপথে সূর্য ঘোরে তা আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যায় ইতিমধ্যে বের করা হয়েছে । একে বলা হয় সোলার এপেক্স (Solar Apex) । পুরো সৌরজগৎটি যে বিন্দুর চারপাশে ঘুরছে তা ইতিমধ্যে পরিমাপ করে বের করা হয়েছে ।


চাঁদও পৃথিবীর চারপাশে প্রায় সারে ২৯ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে ।


কুর্‌আনের বৈজ্ঞানিক যথার্থতার কেউ আশ্চর্য না হয়ে পারে না । আমাদের মনে কি প্রশ্ন আসে না যে, কুর্‌আনের এই জ্ঞানের উৎস কোথায় ?


সূর্যের ধ্বংস

পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে সুর্যের পৃষ্ঠে ক্রমাগত রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে আলো সৃষ্টি হচ্ছে । কোন একদিন এই বিক্রিয়া শেষ হবে এবং সেইদিন সুর্যও ধ্বংস হয়ে যাবে । এর ফলে পৃথিবীর সকল জীবের পরিসমাপ্তি ঘটবে । সূর্যের ধ্বংস সম্বন্ধে কুর্‌আন বলে,


আর সূর্য নির্দিষ্ট গন্ডির মাঝে আবর্তন করে । এ শক্তিমান, সর্বজ্ঞ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট ।

And the Sun runs its course for a period determined for it; that is the decree of (Him) the exalted in Might, the All-Knowing.

কুর্‌আন ৩৬;৩৮


মুস্তাক্বার্‌ নামে যেই আরবী শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নির্দিষ্ট কোন স্থান বা সময়কে বুঝায় । এভাবে কুর্‌আন নির্দেশ করে সূর্য কোন নির্দিষ্ট স্থান ও নির্দিষ্ট সময়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে; যার অর্থ একদিন সুর্য ধ্বংস হবে ।


আন্তঃমহাকর্ষীয় বস্তু

জ্যোতির্বিদ্যায় আগে মনে করা হত মহাবিশ্বের নক্ষত্ররাজির মধ্যে পুরোটাই শূণ্য । কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখন জানেন যে নক্ষত্ররাজির মাঝে পদার্থ আছে যার নাম দেয়া হয়েছে প্লাজমা । প্লাজমা হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে আয়নিত গ্যাস যা সম্পরিমাণ মুক্ত ইলেক্ট্রন ও প্রোটন বহন করে । প্লাজমাকে কখনো কখনো পদার্থের চতুর্থ অবস্থাও বলা হয়ে থাকে । কুর্‌আন আন্তঃমহাকর্ষীয় বস্তু সম্পর্কে বলে,


তিনি আকাশ, পৃথিবী এবং দুয়ের মধ্যবর্তী সমস্তকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেন,

He Who created the heavens and the earth and all that is between.

কুর্‌আন ২৫;৫৯


এটা হাস্যকর হবে যদি কেউ বলে যে আন্তঃমহাকর্ষীয় পদার্থের কথা ১৪০০ বছর আগে মানুষের জানা ছিল ।


ক্রমবর্ধমান মহাবিশ্ব

১৯২৫ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ প্রমাণ করেন যে, নক্ষত্ররাজি একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যা নির্দেশ করে মহাবিশ্ব ক্রমবর্ধমান । মহাবিশ্ব যে ক্রমবর্ধমান তা এখন একটা বৈজ্ঞানিক সত্য । মহাবিশ্বের এই আচরণ সম্পর্কে কুর্‌আন বলে,


With power and skill did We construct the Firmament: For it is Who create the vastness of Space.

কুর্‌আন ৫১;৪৭


এখানে আরবী শব্দ মুসিনুউন ব্যবহার করা হয়েছে যা সঠিকভাবে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “expanding it” । এবং এটা মহাবিশ্বের ক্রমবর্ধমান বিশালতাকেই নির্দেশ করে ।


বিখ্যাত astrophysicist স্টীফেন হকিং তার “A Brief History of Time” এ বলেছেন, “The discovery that the universe is expanding was one of the great intellectual revolutions of the 20th century” । মানুষ টেলিস্কোপ তৈরীরও আগে কুর্‌আন মহাবিশ্বের ক্রমবর্ধমানতা সম্পর্কে বলেছে !


কেউ কেউ বলে থাকেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই সত্যগুলো আশ্চর্য হওয়ার মত কিছু না, কারণ আরবরা তখন জ্যোতির্বিদ্যায় অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছিল । এটা ঠিক যে আরবরা জ্যোতির্বিদ্যায় বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছিল । কিন্তু তারা এ ভুলে যায় যে, তারা যখন জ্যোতির্বিদ্যায় অগ্রগতি লাভ করেছিল তার অনেক আগেই কুর্‌আন নাজিল হয়েছিল । তার উপর বিগ ব্যাংগ এর মত কিছু ঘটনা যা কুর্‌আন নির্দেশ করেছে, তা আরবদের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সময়েও আবিস্কৃত হয় নি । তাই এই বৈজ্ঞানিক সত্য ঘটনাগুলো যা কুর্‌আনের নির্দেশ করা হয়েছে, তা আরবদের জ্যোতির্বিদ্যায় অগ্রগতির ফসল ছিল না । সত্যি কথা বলতে, বরঞ্চ উল্টটাই সত্যি যে, আরবরা জ্যোতির্বিদ্যায় অগ্রগতি লাভ করেছিল, কারণ জ্যোতির্বিদ্যা কুর্‌আনের একটা অংশ দখল করে আছে ।

Sunday, July 20, 2008

বউ পেটানো

মাসুদ রানা

১৯ জুলাই, ২০০৮, সুকুবা, জাপান

বউ পেটানো

গত বছর দেশ থেকে ফেরার পর আমি ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর লেকচার শুনেছি, কিছু পড়াশোনা করেছি, অনেক আলোচনা করেছি, এবং প্রচুর চিন্তা করেছি । ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে মনে হত ইসলাম একটা চমৎকার জিনিস । কিন্তু আমাদের দেশের মুসলমান, এবং অন্যান্য দেশের মুসলমানদের দেখে তা মনে হত না এবং এখনও তা মনে হয় না ।


প্রথম কথা হচ্ছে আমরা ইসলামের মত এত চমৎকার একটা জিনিস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি না, আর যারা আমাদের দেশের তথাকথিত ধার্মিক বলে পরিচিত তারাও কোন না কোন ভাবে ব্রেন ওয়াশ্‌ড হয়ে যায় ।


যাই হোক, আজকে আমি ঐ সম্পর্কে বলবো না । আজকে স্বামী-স্ত্রী নিয়ে কিছু বলবো । ইসলাম মানুষকে চিন্তা করতে বলেছে । কোরানে যে কতবার কত ভাবে মানুষকে চিন্তা করতে বলা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই । কোরানে জ্ঞান সম্পর্কে বলা আছে ৮৫৪ বার । আর এই জ্ঞান অর্জন করা বা চিন্তা করা কিছু তথাকথিত আলেমদের কাজ না, আমাদের সবার কাজ; এবং আলেমরা সবসময় যে ব্যাখ্যা দেয় তাও সবসময় ঠিক হওয়ার কথা না, কারণ তারা ভূল করতেই পারে ।


আমাদের দেশের তথাকথিত ধার্মিকরা সবসময় বলে থাকে, পুরুষ হচ্ছে ঘরের গার্ডিয়ান । হায় অজ্ঞ, কোথায় পেয়েছে তারা এই কথা ? কোরানে ? আমি বলছি কোথায় পেয়েছে সূরা নিসার আয়াত নম্বর ৩৪ এ । এই আয়াতের একদম প্রথম অংশ হচ্ছে, পুরুষ নারীর রক্ষাকারী এবং ভরণপোষণকারী, কারণ আল্লাহ্‌ এককে অপরের উপর বিশিষ্টতা দান করেছেন । শুধু এই অংশটুকু নিয়েই আমার অনেক কিছু বলার আছে, কিন্তু আজ থাক । এই আয়াতের এই অংশটুকু অনেকে ভূল অনুবাদ করে থাকে এইভাবে যে, পুরুষ নারীর রক্ষাকর্তা, কারণ আল্লাহ্‌ এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন । আর এই ভূল অনুবাদ পড়ে আমাদের পুরুষেরা বিশেষ করে মোল্লারা মনে করে যে, তারা তাদের স্ত্রীদের চেয়ে সেরা এবং, স্ত্রীদের একমাত্র কাজ হচ্ছে, স্বামীর সেবা করা । হ্যাঁ, আমি জানি, কোরানে বলা আছে, স্ত্রীদের স্বামীর প্রতি অনুগত থাকতে, কিন্তু আমাদের দেশের লোকেরা বা মোল্লারা যেই অনুগত বোঝায়, এই অনুগত সেই অনুগত না, সত্যি বলছি অনুগত থাকার প্যাটার্ন ঐরকম না ।


এবং সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতে এও আছে, যদি স্ত্রীরা অবাধ্য হয় তাহলে তাদেরকে প্রহার কর । যদিও প্রহার করার আগে ২ টা শর্ত আছে । স্ত্রীর সাথে করতে বলা হয়েছে সদয় ব্যবহার । বেশ কয়েকবার বলা আছে । এমনকি কোরানে এও বলা আছে, যদি কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে পছন্দ নাও করে তাও যেন সে সদয় ব্যবহার করে । একজন পুরুষ যখন তার স্ত্রীকে মারে, কিংবা তারই ছেলে-মেয়েদের সামনে মারতে যায়, আমার প্রশ্ন ঐ লোকের কাছে, সে কি আসলেও মুসলমান ? সে তো আল্লাহ্‌র আদেশ সরাসরি অমান্য করছে । শুধু দিনে পাঁচবার নামাযের নামে উঠাবসা করব, কিন্তু মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করব, মানুষকে গালি দিব; আর জান্নাতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখব ! হায় ! কি মূর্খতা । সূরা নিসায় কখনোই বউকে পেটানোর কথা বলা হয় নি । ঐ আয়াতে আরবী ওয়াদরিবু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার মূল শব্দ হচ্ছে দারাবা । দারাবা এর অর্থ বাংলায় একটা মাত্র শব্দে করাটা কঠিন, আসলে সম্ভবই না । তাই আমাদের অনুবাদকেরা ঐটাকে প্রহার করা হিসেবে অনুবাদ করেছে । ইংরেজিতে বললে কিছুটা কাছাকাছি বলা যায়, step forth, tap। তাও অনেক বুঝানোর পরে , তারপর একই বিছানায় না ঘুমিয়ে, তারপর সেইটা । হাদীস কুর্‌আনকে বুঝতে সাহায্য করে । বুখারী, মুসলিম এর হাদীস,

"Could any of you beat your wife as he would a slave, and then lie with her in the evening?"
এই বৌ পেটানো সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ্‌ আবু দাউদ এ বলেছেন,

"Never beat God's handmaidens."

আর রাসুলুল্লাহ্‌(স) যেখানে বলেছেন, তোমাদের মাঝে সেই সেরা মুমিন যে তার স্ত্রীর কাছে সেরা । স্ত্রীর সাথে চরম খারাপ ব্যবহার করে কিভাবে একজন মানুষ মুমিন হওয়ার স্বপ্ন দেখে ? স্ত্রী অবাধ্য হলে আমরা তাকে বুঝাতে পারি, কিন্তু কখনোই খারাপ ব্যবহার করতে পারি না । স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে আল্লাহ্‌র সামনে গিয়ে দাঁড়াতে লজ্জা করে না ?


কিছুদিন আগে আমার এক বান্ধবী ৫০টা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আত্নহত্যা করার চেষ্টা করেছিল । আল্লাহ্‌ তাকে রক্ষা করেছেন, আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ । আমি তার সাথে কথা বলেছি, এই ঘটনার পরে । তার একটা দুঃখ হচ্ছে, তার মা বাবার সাথে মিল নেই । এমন না যে, এরকম ঘটনা ঘটে না, প্রায়ই ঘটে । কিন্তু আমার দেখা এই ছিল প্রথম, এবং ঘটনাটা মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটেছে । বাবা মার এই ঝগড়া, মায়ের উপর বাবার অত্যাচার যে ছেলেমেয়েদের উপর কেমন প্রভাব ফেলে, একমাত্র যাদের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তারাই বলতে পারবে !! আল্লাহ্‌ এদের কিভাবে মাফ করবেন ? যারা নিজেদের স্ত্রীদের উপর শারীরিক কিংবা মানষিক, কিংবা দুইভাবেই অত্যাচার করে, তারা কিভাবে আল্লাহ্‌র ঘনিষ্ঠতা অর্জন করবে ? তারা কিভাবে জান্নাতে যাবে ?


হয়তো বউ পেটানোর ট্রেডিশনটা এখন আর তেমন নেই, কিন্তু স্ত্রীরা শুধু স্বামীর সেবা করবে এই ধারণাটা এখনও আছে । সেবার ধরণটা কি সেটা যদি মোল্লাদের জিজ্ঞেস করা হয়, আমার মনে হয় পরিস্কার করে বলতে পারবে না ।


নামায এত চমৎকার একটা জিনিস ! একজন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পরে এমন মানুষ কিভাবে মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে ? সে কি আসলেও নামায পরে, নাকি নামায কি তাই ই জানে নাশুধু উঠা-বসা করে ? নামাযে যে শান্তি পাওয়া যায়, ঐ শান্তি নিয়ে কিভাবে একজন মানুষ অন্য মানুষের সাথে কিভাবে খারাপ ব্যবহার করে, কিভাবে অন্যকে খারাপ নামে ডাকে, কিভাবে অন্যকে গালি দেয়, কিভাবে নিজের আত্নীয়-স্বজনের সাথে রূঢ় ব্যবহার করে ? এরা কি আল্লাহ্‌র সান্যিধ্য পাবে ?


আমাদের দেশের হুজুর-মোল্লাদের তাদের ছেলেমেয়েরা দেখলে ভয় পায় । কেন ? তাদের মুখে হাসি থাকে না । ছেলেমেয়েদের সাথে সময় দেয় না । ভালভাবে কথাও বলে না । এদেরকে ছেলেমেয়েরা কিভাবে মান্য করবে ? রাসুলুল্লাহ্‌(স) যখন তার মেয়ে ফাতিমার কাছে যেতেন, তখন কপালে চুমু খেতেন । তারপর তাকে আস্তে করে নিজের পাশে বসিয়ে গল্প করতেন । রাসুলুল্লাহ্‌(স) যখন বাসা থেকে বের হতেন, তখন তার স্ত্রী আয়েশার হাতে চুমু খেতেন । কি শিখেছি আমরা এইখান থেকে ? যারা মুখে বলে রাসুলুল্লাহ্‌(স) আমাদের আদর্শ, যতদিন না পর্যন্ত তারা নামায-রোযার বাইরে এইসবও করতে পারবে, কিভাবে বলবো তারা রাসুলুল্লাহ্‌(স) এর আদর্শকে মেনে চললো ? অজ্ঞরা তর্কের খাতিরে বলবে, ছেলেমেয়েরা ভাল না, বউ ভাল না । হায়রে, ছেলেমেয়েরা তো বাবার পরে জন্ম নিয়েছে, বউ তো নতুন অবস্থায় স্বামীর ঘরে এসেছে, যদি স্বামী নিজে ভাল হত, তাহলে ছেলেমেয়েও ভাল হত, বেয়াদব হত না । ছেলেমেয়ে বেয়াদব যদি হয়েই থাকে, তাহলে তা ঐ লোকটার কারণেই হয়েছে । আর সত্যি কথা, একজন মুসলমান, কিভাবে তার বউ, ছেলেমেয়ে, আত্নীয়-স্বজনদের নিন্দা করতে পারে ? গালি দিতে পারে ? রাসুলুল্লাহ্‌(স) কি এগুলো করতেন ? আমরা শুধু নবীর মসজিদের ভিতরের অংশটুকুই পালন করি, মসজিদের বাইরে করি না । আল্লাহ্‌ মানুষকে দুনিয়াতে তার প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছেন । মানুষের কাজ কি এক কথায় বলতে গেলে, দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা । আর যে লোক, সে যতোই নামায-রোযা করুক না কেন, যদি নিজের ঘরে শান্তি রাখতে না পারে ধিক তারে, সে যেন নিজেকে মুসলমান না বলে !


ডা, লুৎফর রহমানের উচ্চ জীবন এর একটা উদ্বৃতি দিয়ে শেষ করি ।


পত্নীকে ভাল হবার উপদেশ দিলে চলবে না । পুরুষেরা যদি নিজেদের স্বভাব ও ব্যবহারগুলিকে সুন্দর না করেন তাহলে শুধু নারীকে ভাল হবার জন্যে যতই বলা হোক না কেন, কোন কাজ হবে না । যত আঘাত করবে মানব-আত্না ততই বিদ্রোহী হবে । হীন নরপিশাচের স্পর্শে এলে অতি ভাল লোকও জঘন্য প্রকৃতির হয়ে ওঠেন । স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে যদি প্রেম ও শ্রদ্ধা করেন, তাহলে মানুষের জীবন কত সুখময় হয় ।


আল্লাহ্‌ আমাকে এই বেড়াকল থেকে বাইরে থাকতে সাহায্য করবেন এই আমার আশা । আমার যেকোন ভুলের জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।


বিদ্র,

বউ পেটানো সম্পর্কে ইউসুফ এস্‌টেস এর একটা ভাল আর্টিকেল আছে । ইচ্ছা করলে দেখতে পারেন ।


http://www.islamnewsroom.com/content/view/352/52/

Friday, July 18, 2008

অভিযোগ

মাসুদ রানা

১৮ জুলাই, ২০০৮, সুকুবা, জাপান

অভিযোগ

ছোটবেলা থেকেই ইসলামের একটা জিনিস আমার খুব ভাল লাগত । সেটা হচ্ছে ভোরে ঘুম থেকে উঠা । নজরুলের কবিতায় সেই কবে পড়েছিলাম, সূর্য্যিমামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে এই কথাটি এখনও আমার মনে গেঁথে আছে । কিন্তু যতই বড় হচ্ছিলাম, আমাদের তথাকথিত ধার্মিকদের কাছ থেকে ইসলামের সৌন্দর্য তো দূরে থাক, শুধু তাদের কালো অংশটুকুই দেখতে পেয়েছি । তথাকথিত ধার্মিকরা -- যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, তারা কি আসলেই ধার্মিক ? নামাযই কি মানুষকে মানুষ বানায় ? আমি বলছি না সব নামাযীই এক; কিন্তু আমার দেখা বেশীরভাগই ঐরকম ।


আমি ধার্মিক দেখেছি, কিন্তু তাদেরকে দেখেছি খুবই অসামাজিক হিসেবে । আমি ধার্মিক দেখেছি, কিন্তু তাদেরকে দেখেছি অলস হিসেবে । আমি ধার্মিক দেখেছি, কিন্তু তাদের হাসিমুখ খুব কমই দেখেছি, তাদেরকে বেশীরভাগ সময়ই দেখেছি গোমরামুখে । আমি ধার্মিক দেখেছি, কিন্তু তাদেরকে মানুষের সাথে ভালভাবে মিশতে দেখিনি, দেখেছি একটা গ্রুপের নির্দিষ্ট কিছু তাদেরই মত মানুষের সাথে মিশতে । আমি ধার্মিকদের দেখেছি দেখেছি পরনিন্দা করতে । আমাদের ধার্মিকরা, ছেলেমেয়েদের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা তো দূরে থাক, তাদেরকে দেখেছি তাদের ছেলেমেয়েরা ভয় পায় । আমি ধার্মিকদের দেখেছি নিজের স্ত্রীদের সাথে চরম খারাপ ব্যবহার করতে । আমি জ্ঞানহীন ধার্মিকদের দেখেছি । আমি দেখেছি ধার্মিকদের, যাদের অন্তরে গরীব অভাবীদের জন্য কোন মায়া নেই । আমি ব্রেন ওয়াশ্‌ড ধার্মিক দেখেছি । আমি কাজহীন, অলস, অজ্ঞ ধার্মিকদের ঘরকুনো হয়ে থাকতে দেখেছি । আমি ধার্মিক দেখেছি, যারা কথায় কথায় অপরকে কাফির বলে, এবং কি করলে জান্নাতে যাওয়া যায় তার সহজ পথ ( ? ) দেখায় !!


আমি ধার্মিক দেখেছি শুধু মসজিদে নামাযে অবস্থায় । শুধু নামাযটাকেই তারা ইসলাম বলে মনে করে বসে আছে । হায়, কি ভুলের মাঝে আছি আমরা । আমরা রাসুলুল্লাহ্‌র শুধু মসজিদের ভিতরের অংশুটুকুই নিয়েছি । একটা হাদীস বোধ হয় আছে (সহীহ্‌ কিনা জানি না), কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ দিন সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব নিবেন, এবং ঐটায় পাশ করলেই জান্নাত ওয়াও ! হায়রে বোকা !! ধরে নিলাম হাদীসটা সহীহ্‌, তারপরও বলছি নামায কি সেইটা কি আগে জেনে নিন । একটা কথা বলি, নামায হচ্ছে আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্ক তৈরী করার একটা জিনিস । না বুঝে নামায পড়লে আল্লাহ্‌র সাথে কিভাবে সম্পর্ক তৈরী হওয়া সম্ভব ?


আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, একজনের সাথে খারাপ ব্যবহার করে নামাযে আল্লাহ্‌র সামনে দাঁড়াতে ধার্মিকদের লজ্জা করে না ? আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে জুময়ার দিন গরীব, প্রায় অর্ধ-নগ্ন বয়ষ্ক লোকদের পায়ে ঠেলে মসজিদে গিয়ে তারা যে নামায পড়ে, সেটা কি আসলেও নামায ? আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে রাসুলুল্লাহ্‌ কি এমন করতে পারতেন ? এইসব ধার্মিকদের হৃদয় খুলে আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করে ।


ধার্মিকেরা রাসুলুল্লাহ্‌কে মডেল হিসেবে দেখে । অবশ্যই মুহাম্মদ(স) আমাদের মডেল, কারণ আল্লাহ্‌ কোরানে সেই কথা আমাদেরকে বলেছেন । আসুন দেখি, আমরা উনাকে কিভাবে মান্য করি বা অনুসরণ করি । রাসুলুল্লাহ্‌ পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তেন, ধার্মিকেরাও পড়ে । রাসুলুল্লাহ্‌ রোযা রাখতেন । ধার্মিকেরাও রাখে । কিন্তু


১, একদিন রাসুলুল্লাহ্‌ বসে ছিলেন । আর সাহাবীরা ইসলাম আসার পূর্বে অজ্ঞানতার যুগে কি কি করতেন তা বলতেছিলেন । আর রাসুলুল্লাহ্‌ মিটিমিটি হাসতেছিলেন । চিন্তা করে দেখুন, ধরে নিলাম মুহাম্মদ(স) তখন রাসুল হন নি । তারপরেও ভেবে দেখুন, তার চেয়ে কম বয়সী সাহাবী ঐখানে নিশ্চয়ই ছিল । তারা একজন বয়সে বড় মানুষের সামনে তাদের আগের অজ্ঞানতার কথা বলছিল । কতটা খোলা মনের মানুষ হলে একজন সিনিয়রের সামনে একজন জুনিয়র এইসব কথা বলতে পারে । আমি নিজের জীবন দিয়েই চিন্তা করেছি । এইরকম সিনিয়র তো খুব বেশী নেই, যাকে আমি আমার ডেটিং এর গল্প বলতে পারব । এবং এসব শুনে রাসুলুল্লাহ্‌ কপাল কুকরাননি, বরঞ্চ মিটিমিটি হাসছিলেন ।


এখন আমাদের ধার্মিকদের কথা ভাবা যাক, প্রথম কথা হচ্ছে, ধার্মিকদের সাথে কথা বলার কোন ইচ্ছাই তৈরী হয় না, তাদের গোমরা মুখ দেখে । আর কোনমতে যদি বলে ফেলি যে, আমি ঐদিন একটা মেয়ের সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম, নাউজুবিল্লাহ্‌ বলে মুখ ফিরিয়ে নিবে । পারলে আমাকে জাহান্নামের টিকিট ধরিয়ে দিবে । এইখানে একটা কথা আমার মনে হয়, যারা খারাপ তাদের খারাপের পিছনে যারা ভাল তাদের কিছুটা হলেও দোষ আছে, কারণ তারা ঐ খারাপদের দূরে সরিয়ে রাখে ।


২, একদিন রাসুলুল্লাহ্‌ বসেছিলেন । এমন সময় বিয়ে বাড়ি থেকে একটা মেয়ের দল আসছিল । রাসুলুল্লাহ্‌ দাঁড়িয়ে ওদেরকে সম্বোধন করলেন এবং সালাম দিলেন । আমাদের ধার্মিকরা মেয়েদের আনন্দ দেখতে পারে না । হ্যাঁ, এইটা ঠিক যে, আমরা এনজয় করার নামে অশ্লীলতা করি । পর্দা করি না । কিন্তু হাতে ঘা হলে তো আমরা হাত কেটে ফেলতে পারি না । কিন্তু ধার্মিকেরা মেয়েদের কোনভাবে আনন্দ করতে দিতে চায় না । তারা পর্দা করতে বলতে পারে, কিন্তু আনন্দ করতে তো না করতে পারে না !


৩,আমার জানা সবচেয়ে রোমান্টিক লোক হলেন মুহাম্মদ(স) । তার রোমান্টিকতার একটা ঊদাহরণ দিই । ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তিনি আয়েশা(রা) এর হাতে চুমু খেতেন । আমাদের ধার্মিকদের কয়জন স্ত্রীদের সাথে রোমান্টিক ? স্ত্রীরা তো ধার্মিকদের দেখলে ভয় পায় । রাসুলুল্লাহ্‌র স্ত্রীরা তার সাথে খোলা মনে কথা বলতে পারতেন । আর আমাদের ধার্মিকদের গোমরা কালো মুখ দেখলে স্ত্রীদের পিলে চমকে যায় ।


৪, এক ধার্মিক লোক ছিল । পাঁচ ওয়াক্ত নামায রোযা কিছুই তার বাদ যেত না । প্রতি ভোরে অন্যদেরকে ফজর নামাযের জন্য ঘুম থেকে জাগাত । কুরবানির ঈদের সময় তার হচ্ছে ব্যস্ত সময়, কারণ অনেকেই তাকে অনুরোধ করে তাদের গরুটা জবাই দিয়ে দেয়ার জন্য । তাদের আশা, হয়তো এই ধার্মিক লোকের কারণে তাদের কুরবানী কবুল হয়ে যাবে । হায়রে অজ্ঞ মানুষ ! হায়রে প্রতারক ভন্ড ঐ লোক ! লোকটার মুখে আমি কোনদিন হাসি দেখি নাই । এলাকার লোকদের সাথে কোনদিন মিশতে দেখি নাই । আমাদের রাসুলুল্লাহ্‌(স) কি এই ধরণের মুসলমান চেয়েছিলেন ? মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া ছাড়া আল্লাহ্‌র ঘনিষ্ঠতা কি পাওয়া সম্ভব ?


৫, মুহাম্মদ(স) কে দেখে কেউ উঠে দাঁড়াত না, কারণ রাসুলুল্লাহ্‌ বারণ করে দিয়েছিলেন । এবং আমি যতদূর জানি মুহাম্মাদ(স), তাকে অন্য কেউ সালাম দিবে তার জন্য অপেক্ষা করতেন না, তা অন্য কেউ বয়সে ছোটই হোক বা বড়ই হোক । এইক্ষেত্রে শুধু ধার্মিকেরা না, আমাদের দেশের সিনিয়ররা সবায়ই অপেক্ষা করে জুনিয়ররা কখন সালাম দিবে তার জন্য । এমনকি কেউ সালাম না দিলে কিংবা উঠে না দাঁড়ালে তাকে বেয়াদব তেয়াদব অনেক কিছুই বলা হয়ে থাকে । এইটা কি ইসলামের পথ ? আমি একদিন এক লোককে সালাম দেই নি বলে সে আমার মায়ের কাছে এসে অভিযোগ করেছিল, আমি কি আসলেই মুসলমান কি না ? হায়রে অজ্ঞ !


শুধু আচার আচরণ পালন করাই আজাকালকার দিনে ধর্ম মনে করে থাকে মানুষ । ওরে মূর্খ ! তাই যদি হতো, তাহলে মুসলমানেরাই আজকে দুনিয়ার সেরা জায়গায় থাকত । জুময়ার নামায শেষে শুধু আমেরিকানদের গালাগালি করলে কোন লাভ হবে না । ওর কোন অর্থ হয় না ।


ডা, লুৎফর রহমানের ধর্ম জীবন বইয়ে বলেছেন, মুসলমান জাতির ধর্ম, এই জাতির জীবন ও আত্নার উপর কোন প্রভাব বিস্তার করে না । নামায ! নামায ! নামায ! আজান শুনলে পূণ্যের জন্য মুসলমানেরা মসজিদ ঘরের দিকে সন্তান সঙ্গপ্রয়াসী গাভীর মতো পুচ্ছ তুলে দৌড় দেন । মুসলমান জাতির এই ভূল কঠিন আঘাতে ভাঙ্গতে হবে । ধর্ম অর্থ পাপ বর্জনের সাধনা । মিথ্যার সংগে আত্নার সংগ্রাম । প্রার্থনায় এই কাজের সহায়তা হবে এই জন্য ইসলাম ধর্মে প্রার্থনার ব্যবস্থা । আমি মুসলমান জাতিকে সাবধান করছি তারা যদি শুধু রোজা-নামাযকেই ধর্ম মনে করে বসে থাকেন, তবে তারা পরকালে কোনমতে মুক্তি পাবেন না ।



আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, রোযা-নামাযের অন্তরালে জীবনকে মিথ্যামুক্ত করতে চেষ্টা কর । জেনেশুনে অন্যায় ও মিথ্যা করে সর্বদা মসজিদ ঘরে যেয়ো না ও ভন্ডামী ঈশ্বর সহ্য করতে পারেন না । যে চোর ঘুষখোর, প্রতারক, পরনিন্দুক, আহম্মক, অশিক্ষিত, পরস্বার্থহারী, বিশ্বাসঘাতকতার আবার রোজা-নামায কী ? তোমার লম্বা জামা, দীর্ঘ নামায এবং লম্বিত শ্মশ্রুতে তুমি কিছুতেই বেহেস্তে যাবে না । রে ঘুষখোর দুর্মতি, রে হারামখোর, বেশ্যা তোমরা কি কপালে তিলক কাটলে, তীর্থে যাত্রা করলে ?


ডা, লুৎফর রহমানের আরো কিছু কোটেশন দিচ্ছি ।

সর্ব পাপমুক্ত হওয়াই ইসলাম ধর্ম । মুসলমানের ধর্ম জীবনের একমাত্র সাধনা পাপকে জয় করা । হে আল্লাহ্‌, আমি শয়তানের হাত হতে তমার কাছে আশ্রয় চাই এই হচ্ছে তার বড় প্রার্থনা । তার জীবনে পাপ-পূণ্যের কাটা-কাটি, জমা-খরচ হবে না । নামাযের পূন্য আলাদা, পাপের শাস্তি আলাদা তা হবে না ! তা হবে না ! নামায পড়লে পাপের ক্ষমা হবে না । না বুঝে নামায পড়া এও ইসলাম ধর্ম নয়, কোন ধর্ম নয় । প্রার্থনা তা আন্তরিক এবং আত্নার সত্য বেদনা নিবেদন হওয়া চাই । মানুষকে কোনরকম দুঃখ দেওয়া পাপ । জগতে দুঃখ সৃষ্টি করা পাপ । তোমার জীবনের দ্বারা, কথা ও ব্যবহারে যদি পৃথিবীতে দুঃখ ও জ্বালা উপস্থিত হয়, তুমি পাপী । নামায দুই-একবার ত্যাগ করলে তত পাপ হয় না, যত হয় মিথ্যা, অন্যায়, প্রবঞ্চনা, ব্যভিচার, লোভ, চুরি, এবং মানুষকে দুঃখ দেওয়াতে । অথচ ঠিক এর উলটো সমাজে চলছে । নামায ঠিক আছে পাপ ও শঠতার অন্ত নেই । ত্বকচ্ছেদ, আরবীতে নাম রাখা, মৃত্যুর পর ফাতেহা পাঠ করা, মসজিদ ঘর তোলা, মৃত্যুর পর খতম পড়ান, লক্ষ কলেমা পাঠ, শ্মশ্রু রাখা এবং ইসলাম ধর্মের গর্ব করাই যেন এদের ধর্ম । আত্নার দিকে এরা তাকায় না ।


মুসলমান শাস্ত্রে নামাযের প্রতি জনসাধারনকে এত কঠিনভাবে ভক্তিমান আদেশ করা হয়েছে, নামায পালন করতে এতবার অনুজ্ঞা করা হয়েছে, নামায ত্যাগ করলে এত ভয়ানক শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে মুসলমান জাতি সব ভুলে নামাজই সর্বাগ্রে পালন করতে অগ্রসর হয় , -- নামায ছাড়া আর কোন কর্তব্যের কথা তাদের মনে আসে না । নামায পড়া তাদের জীবনের বড় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে । আর কোন দ্বায়িত্ব তারা ভাল করে অনুভব করে না । বুঝে হোক, না বুঝে হোক নামায পড়তে হবে । যেসব ইশ্বর বাক্য তারা পাঠ করে সেই বাক্যের মর্ম গ্রহণ তদানুসারে জীবন গঠন করা বিশেষ আবশ্যক বোধ করে না । কোনো রকমে আবৃত্তি করে নামায পড়তে পারলেই তারা মনে করে ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠ আজ্ঞা পালন করা হল, তারা ইসলাম ধর্ম পালন করলো । নামাযের জন্যে এই অতিরিক্ত ভীতি প্রদর্শণ মুসলমান সমাজের ধর্ম জীবনের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে । তার আধ্যাত্নিক জীবন চূর্ণ হয়ে গেছে । নামাযকে ছেড়ে ধর্ম সম্বন্ধে স্বাধীনভাবে কিছু ভাবতে তারা মোটেই সাহস পায় না । নামায-রোযা হয়ে পড়েছে তারা দুই সশরীরি দেবতা । সে এইভাবে প্রাণে মূর্তিহীন প্রতিমা পূজা শুরু করেছে । সে ঈশ্বরকে চেনে না, শুধু নামায পড়ে । তার বিশ্বাস, নামায ত্যাগই সকল পাপের বড় পাপ । কিন্তু তা তো নয় । অকৃতজ্ঞতা, বিশ্বাসঘাতকতা, ক্রূরতা, মিথ্যা, দয়াশূণ্যতা, ছলনা, প্রতারণাই বড় পাপ, কিন্তু সে তা বিশ্বাস করে না, এই অবিশ্বাসই তার পতনের কারণ । এই জন্যই জীবন মানুষের কাছে এত দুঃসহ । নামায অর্থাৎ প্রার্থনা দুই-রকবার ত্যাগ করলে তেমন ক্ষতি হয় না । আসল ধর্ম ঠিক রাখা চাই ।


আমার অভিযোগ সীল মারা ধার্মিকদের কাছে, কেন তারা এত সুন্দর ইসলামটাকে অজ্ঞতা দিয়ে নষ্ট করে দিচ্ছে ? আমার অভিযোগ কেন তারা নামায, রোযা এবং আনুষঙ্গিক কিছু নিয়ম পালন করা ছাড়া কিছুই করে না ? আমার অভিযোগ তাদের কাছে, তারা ইসলামের সৌন্দর্য মানুষকে না জানাতে পারত, কিন্তু পোষাক, টুপি, দাড়ি ইত্যাদি দিয়ে অন্যদেরকে ইসলাম থেকে অনেক দূরে সরে যেতে কেন সাহায্য করে ? আমার অভিযোগ কেন তারা কোন না কোন গ্রুপের অংশ হয়ে যায়, এবং অন্ধভাবে তা আকড়ে ধরে থাকে ? তারা কি একটুও চিন্তা করে না, নাকি আমিই সম্পূর্ণ ভূল ?


আমি আমার যেকোন ভূলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।

Saturday, May 17, 2008

চার বিয়ে


পরম দয়ালু ও অসীম করুনাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি।

আমি এখানে আমার মতামত ব্যাখ্যা করব মাত্র। আল্লাহ সমস্ত জ্ঞানের অধিকারী এবং আমরা আল্লাহর কাছে জ্ঞান প্রার্থনা করি।

ইসলাম কে আক্রমণ করার জন্য হাতিয়ার হিসেবে সবাই চার বিয়েকে বেছে নেয়। তারা বিভিন্ন রকমের যুক্তি বের করে। শুধু তাই না, অনেক মুসলমানরাও এ জিনিসটাকে নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে। আধুনিক বিভিন্ন তত্ত্বকে আমরা এমনভাবে অন্ধ অনুসরন করি যে একটু মুক্তভাবে আমরা চিন্তাও করি না। আমার এই লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য হল এ ধরনের বিভিন্ন ধরনের ভুল যুক্তিগুলোকে খন্ডন করা। আমার সবকিছু যে সঠিক হবে সেটা আমি নিজেও মনে করি না। কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিলে খুশি হব। এ বিষয়ে আলোচনা করার আগে প্রথমে আমাদের ইসলামের মূল শিক্ষা সম্পর্কে জানতে হবে। যেকোন বিষয় পরিপূর্ণভাবে বুঝতে হলে প্রথমে তার বেসিক বিষয়গুলো আয়ত্ব করতে হয়। নিচের বিষয়গুলো নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা যাক।


কুর'আনের শিক্ষা

কুর'আনের শিক্ষাকে যদি এক বাক্যে প্রকাশ করি, তাহলে তা হবে এরকম , "আমি অন্যের জন্য তাই ভালবাসব যা আমি নিজের জন্য ভালবাসি"। মোটকথা আমার মধ্যে কোন ধরনের স্বার্থপরতা থাকবে না। আমি নিজে কোন কিছু পাওয়ার আগে অন্যের কথা চিন্তা করব। অন্যকে ভালবেসে আমি আনন্দ পাব। আর এই ভালবাসা হচ্ছে সত্যিকারের ভালবাসা। কোথা থেকে আসবে সেই ভালবাসা? আমি বলি তা আসবে, স্রষ্টাকে ভালবেসে, জ্ঞান অর্জন করে, এই জীবনের উদ্দেশ্যকে জেনে, নিজেকে জেনে, সত্যিকারের নিজেকে মেনে নিয়ে। অন্যের কষ্ট দেখে আমার অন্তর কাঁদবে, তার কষ্ট দূর করার জন্য আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালাব। আমার মধ্যকার "আমি" রূপান্তরিত হবে "আমরা"তে। অথচ অজ্ঞতা আমাদেরকে আজ এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে যে, আমি সুখী হলেই যথেষ্ঠ, অন্যেরা কি রকম আছে তা আমার দেখার বিষয় না। আমরা আজ এতটাই স্বার্থপর হয়েছি যে, আমার নিজের জন্য সবসময় সেরা জিনিসটা চাই। নিজে কষ্ট করে অন্যের উপকার করা, নিজের কোন কিছু ত্যাগ করা আমরা আজ প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। হ্যা, আমরা অন্যের উপকার করি, তবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের স্বার্থে আঘাত না হানে। আমরা তাদের উপকার করি, যাদের কাছ থেকে আমার উপকার পাবার সম্ভাবনা থাকে। তবে আমি হতাশ না, পৃথিবীতে এখনও অনেক ভাল মানুষ আছে, মানুষের মাঝে অনেক অনেক ভাল গুণাবলী আছে, আরে সে জন্যই আমি একজন মুমিন। কুর'আনের অন্যতম একটা কাজ হচ্ছে মানুষের অন্তরের এই সমস্ত রোগকে সারিয়ে তোলা।


মেয়ে হল মানুষ তৈরির কারিগর

ইসলামে নারীকে মায়ের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। মায়ের কাজ হল মানুষ গড়ে তোলা। মানুষ গড়ে তোলাকে আজ আমরা গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজই মনে করি না। আমাদের কেউ যখন কোন একটা যন্ত্র তৈরি করে, কোন আবিষ্কার করে, তখন আমরা তার কত প্রশংসা করি, তাকে অভিনন্দন জানাই, তাকে পুরষ্কৃত করি, তার গুণগান গাইতে থাকি। অথচ আমরা কখনও চিন্তা করে দেখি না যে, একজন মানুষ তৈরি করা তার থেকে কত গুণ কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একজন সুন্দর মনের, সুন্দর চরিত্রের, জ্ঞানসম্পূর্ণ মানুষ তৈরি করা কি এত সহজ? আমরা আমাদের আশেপাশে একটু ভাল করে তাকিয়ে দেখি। মানুষের কোন অভাব নেই। কিন্তু কয়জন মানুষ পাব আমরা যাদের থেকে আলো ছড়ায়। বর্তমান সময়ের বিভিন্ন নৈতিক অবনমন এবং অজ্ঞানতার নিদর্শন হচ্ছে আমরা মাদেরকে তাদের কাজের জন্য যথাযথ মূল্যায়ণ করি না। আমরা কখনই একজন মাকে প্রশংসা করি না। সন্তান লালন করাকে আমরা খুবি তুচ্ছ কাজ হিসেবে গণ্য করি। একজন মানুষকে বড় করা, মানুষকে, এটা তুচ্ছ করার মত কোন বিষয় না। একটি সন্তানের জন্মের পর থেকে তার পরিপূর্ণভাবে বড় হওয়া পর্যন্ত তার দরকার সার্বক্ষনিক ভাল সাহচর্য, সঠিক দিক-নির্দেশনা, সঠিক জ্ঞান, ভালবাসা, যত্ন ও আরো অনেক কিছু। তাকে মানুষসহ সমস্ত সৃষ্টিকে ভালবাসতে শেখাতে হবে, তাকে মনের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করতে হবে। এসব কিছুর জন্য মায়ের ভূমিকা হল প্রধান এবং অন্য কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, যন্ত্রকে দিয়ে একে প্রতিস্থাপন করা যায় না, যাবে না। নেপোলিওনের সেই বিখ্যাত উক্তিটা উল্লেখ করা যাক। "আমাকে তোমরা ভাল মা দাও, আমি তোমাদের ভাল জাতি দেব।"


মেয়ে হল পালনকর্তা

একজন মেয়ের ভূমিকা শুধু মা হিসেবেই না, পরিবারের পালনকর্তা হিসেবে তার অনেক বড় এবং সম্মানজনক ভূমিকা। একজন নারী তার স্বামীকে লালন-পালন করে, পরিবারের প্রতিটা সদস্যকে সে লালন- পালন করে। আল্লাহ এর রব বা পালনকর্তা গুণের সবচেয়ে বড় অধিকারী হচ্ছে একজন নারী। অথচ আমরা মেয়েদেরকে, মাদেরকে, স্ত্রীদেরকে তাদের প্রাপ্য সম্মানটা দেই না। প্রায়ই তাদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। অথচ স্বামীরা যদি স্ত্রীকে তার কাজের জন্য ধন্যবাদ জানাত নিয়মিত, প্রশংসা করত, স্ত্রীদের আরো সময় দিত তাহলে মেয়েরাও কত আনন্দের সঙ্গে তার উপর অর্পিত দায়িত্বটা পালন করত। মেয়েদের উপর সব দোষ দিতে ছেলেরা খুব ওস্তাদ। এর থেকে বের হয়ে আসতে হবে।


ছেলে ও মেয়ের আলাদা আলাদা দায়িত্ব

ছেলেদের দায়িত্ব হচ্ছে সংসারের ভরণ-পোষন করা, খাবারের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজন মেটানো ইত্যাদি। ছেলে এবং মেয়ে, প্রত্যেকে তার নিজস্ব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের উপযুক্ত করে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে খুব জনপ্রিয় একটা স্লোগান হচ্ছে "ছেলে মেয়ে সমান"। আর আমরাও কোন কিছু চিন্তা না করে এটাকে মেনে নিয়েছি। আমার কাছে এর থেকে বড় মিথ্যা আর হতে পারে না। আমি কিভাবে একজন মেয়ের সমান হব, যেখানে আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি যে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে আমি তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এমন অনেক কিছু আছে যা শুধু মেয়েরাই পারবে, আবার এমন অনেক কিছু আছে যা শুধু ছেলেরাই পারবে। আমি বলব, ছেলে মেয়ে সমান বলে দুই পক্ষকেই অপমান করা হয়। যেখানে, ছেলে মেয়ে একজন আরেকজনকে সাহায্য করে, একে অপরের সহায়ক হিসেবে চমৎকার মানবজাতি গড়ে তোলে, আনন্দময় পৃথিবী পাই আমরা, সেখানে তাদেরকে একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রাণান্তর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর থেকে বড় অজ্ঞতা আর কি হতে পারে? আর বানরের মত অন্ধ অনুসরন করে যাচ্ছি আমরা।


জীবনের উদ্দেশ্য নিজেকে গড়ে তোলা

আমাদের এ জীবনের উদ্দেশ্য কি? বিভিন্নভাবে এর উত্তর দেয়া যেতে পারে। আমি এটাকে এভাবে বুঝি। এ জীবনের উদ্দেশ্য হল নিজেকে গড়ে তোলা। এখন প্রশ্ন হল নিজেকে গড়ে তোলা বলতে কি বোঝায়? আর আমি আসলে কে? আমার শরীরটা কি আমি? এই শরীরকে গড়ে তোলা, বড় করা কি এ জীবনের উদ্দেশ্য? আমাদের শরীর এমনিতেই বড় হয়। আমাদের এ বিষয়ে চিন্তা করতে হয় না। শুধুমাত্র খাওয়া-দাওয়া করলেই হয়। এই খাওয়ার ব্যাপারটাও আমাদের এমনিতে হয়ে যায়। আমাদের ক্ষুধা লাগে, আমরা ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাবার যোগাড় করি। তবে একটা সময়ের পর আমরা যতই খাই না কেন, আমাদের শরীর আর বড় হয় না, তারপর আবার তা ছোট হতে থাকে। তাহলে আমিটা কে? আমার অন্তর, আমার আত্মা কি? কুর'আন বলছে আমাদের এই শরীরের বাইরে কিছু একটা আছে যেটাকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। কাজেই আমাদের এমন সাহচার্য দরকার যেখানে আমাদের মনের বিকাশ হবে, জ্ঞানের বিকাশ হবে। অথচ আফসোস যে আজ আমরা শুধুমাত্র আমাদের শরীর নিয়ে মেতে উঠেছি।


কাকে বিয়ে করব?

একজন ছেলে যখন বিয়ে করব তখন কি ধরনের মেয়েকে বিয়ে করবে? সুন্দরী, রূপসী, ধনবতী, বড় ডিগ্রীধারী এ ধরনের কাউকে? নাকি যার আচার-ব্যবহার শালীন, সুন্দর, যার ভিতরে অন্যকে পালন করার গুণ আছে, যার সঙ্গে থাকলে সে তার জীবনের আসল উদ্দেশ্যকে পূরণ করতে পারবে সে ধরনের কাউকে? ইসলাম বলছে দ্বিতীয়জনকে বিয়ে করতে। এবার দেখা যাক, একজন মেয়ে যখন বিয়ে করবে তখন সে কি ধরনের ছেলেকে বিয়ে করবে? লম্বা, সুন্দর, হ্যান্ডসাম, ধনী, বড় ডিগ্রীধারী, সমাজে তথাকথিত উচু অবস্থানে আছে, এ ধরনের কাউকে? নাকি যার আচার-ব্যবহার সুন্দর, যার জ্ঞান আছে, যার সাথে থাকলে জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য পূরণ হবে, স্রষ্টার কাছাকাছি যাওয়া যাবে? ইসলাম বলছে দ্বিতীয়জনকে বিয়ে করতে। বর্তমানে মেয়ে বিয়ে দেবার সময় সবাই দেখে যে যেখানে বিয়ে হবে সেখানে মেয়ের শরীরকে বিভিন্ন রকমের জিনিস দিয়ে সাজিয়ে রাখবে কিনা। আর ছেলেরাও দেখে যে কোন মেয়ের শরীরটাকে ভাল করে সাজিয়ে সমাজে প্রদর্শন করা যায়, যাতে তার স্ট্যাটাস আরো বাড়বে, সবাই বলবে যে ভাই আপনি তো খুব লাকী, খুব সুন্দর মেয়ে পেয়েছেন আর সে মনে মনে তৃপ্তি পাবে। এটা অজ্ঞতা। ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই পূর্ণ সম্মতি লাগে।


জ্ঞানার্জন হল বাধ্যতামূলক

অনেকে আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারে কিন্তু আমি মনে করি যে জ্ঞানার্জন না করে মু'মিন হওয়া যায় না। ছেলে-মেয়ে সবার জন্য জ্ঞান অর্জন করা বাধ্যতামূলক। জ্ঞান কি জিনিস এটা নিয়ে অনেক বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে। আমাদের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সেজন্য দরকার একে অপরের সাথে আলোচনা, পড়াশোনা, ভ্রমণ, পর্যবেক্ষণ, চিন্তা ইত্যাদি। প্রত্যেক নবীর মিশন ছিল মানুষকে শিক্ষিত করা। আমাদের মেয়েদের সঠিক শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা ভাল মা হতে পারে, তার সন্তানদের শিক্ষিত করতে পারে।


এবার মূল অংশে আসা যাক। সূরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতে প্রথমে দুই, তিন বা চার জনের বিয়ের কথা বলা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে যে, যদি ভয় কর যে সমান অধিকার দিতে পারবে না তাহলে একজনকেই। প্রথমে দেখি যে ইসলাম কি এক বিয়ে প্রথাকে একাধিক বিয়েতে নিয়ে এসেছে নাকি বহুবিবাহ থেকে সুনির্দিষ্ট সংখ্যায় নিয়ে এসেছে? উত্তর কিন্তু পরেরটা। নির্দিষ্ট করে বললে ইসলাম এক বিবাহতেই নিয়ে এসেছে। কারন একের অধিক বিয়ে করার ক্ষেত্রে আমাকে কুর'আনের ওই শর্তের কথা বিবেচনা করতে হবে। প্রাচীনকালে মেয়েদের কোন সম্মান ছিল না। ছেলেরা ইচ্ছেমত মেয়েদের বিয়ে করত, ১০ জন, ২০ জন বা আরো বেশি। অন্তত আরব সমাজে এই ছিল অবস্থা। আল্লাহ এখানে সুনির্দিষ্ট একটি নিয়ম এনে দিয়েছেন মানবজাতির জন্য। কাজেই সাধারনভাবে এক বিবাহ। এতে কোন সমস্যা নেই । ইসলাম ও তাই বলছে। তবে ইসলাম বলছে আরো বেশি কিছু যা আমাদের জন্য খুবি উপকারী। যখন পরিস্থিতি দাবী করবে, যখন একজন ছেলে তার সততার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তার সৎ উদ্দেশ্য থাকবে তখন সে ইচ্ছে করলে একের অধিক বিয়ে করত পারবে। পরিস্থিতির দাবী কি? এখানেই আসবে কুর'আনের মূল শিক্ষা, “আমি অন্যের জন্য তাই ভালবাসব যা আমি নিজের জন্য ভালবাসি”।আমি যখন দেখব সমাজে অনেক মেয়ে নির্যাতিত হচ্ছে, অনেক মেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, তখন আমি কেন তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাব না? আবার অনেক মেয়ে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে যায়। অনেক জায়গায় যুদ্ধের কারনে বা অন্য কোন কারনে মেয়ের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও আরো অনেক কারন থাকতে পারে। এখন কাউকে ১০টাকা, ১০০টাকা, ১০০০টাকা দিয়ে সাহায্য করা আর কাউকে সারা জীবনের জন্য সাহায্য করা, কোনটা ভাল? কাজেই আমি যদি চারজন বিয়ে করে সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করি তাহলে সমস্যা কোথায়? একবার চিন্তা করে দেখুন ওই মেয়েগুলো কত খুশী হবে এতে।


প্রশ্ন উঠে যে, প্রথম স্ত্রী তো প্রচণ্ড কষ্ট পাবে। হ্যা, সাধারনভাবে তাই মনে হয়। তবে, সে যদি মু'মিন হয়, সে যদি জ্ঞানী হয়, সে যদি স্বার্থপর না হয়, সে যদি অন্যকে ভালবাসতে পারে তাহলে তা হবে না। কারন তারও অন্তর কাদতে থাকবে তার অন্য বোনদের কষ্ট দেখে। তখন হবে এরকম যে, প্রথম স্ত্রী তার স্বামীকে অনুরোধ করবে অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করতে। আর এরকম কিন্তু ঘটেছে। শুধুমাত্র যদি আমরা ছেলেরা এবং মেয়েরা আমাদের স্বার্থপরতা ও হিংসা- প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত হতে পারি, তাহলে বুঝতে পারব যে একের অধিক বিবাহ কত উপকারী হতে পারে আমাদের সমাজের জন্য। এই পৃথিবীতে বিভিন্ন সমাজ আছে। আমেরিকা, জাপানের মত সমাজ আবার বাংলাদেশ, ভারত এর মত সমাজ, অন্যদিকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সমাজ। বাংলাদেশের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। আমাদের দেশে হাজার হাজার মেয়ে গার্মেন্টস এ কাজ করে মানবেতর জীবন যাপন করছে। হাজার হাজার মেয়ে পতিতালয়ে আছে। কেন? এর সমাধান কি? ধরনের মেয়েরা এবং এর সাথে আরো অনেক মেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কেউ যদি তাকে নিরাপত্তা দিতে চায়, সম্মান দিতে চায় তাহলে তারা তা লুফে নেবে। কাজেই কোন আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন কোন ছেলে যদি এ ধরনের কোন মেয়েকে বিয়ে করে তাকে বাসস্থান, নিরাপত্তা, ভালবাসা, ভরণ-পোষণে পাবার ব্যবস্থা করে তাহলে সেটা কি সমাজের জন্য ভাল নয়?


প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন ছেলের পক্ষে তো চার জন মেয়েকে ভালবাসা সম্ভব না। তাহলে এখানে তো অবিচার হচ্ছে। এটা হয়তো সত্য যে দুইজন মানুষকে সমান ভাবে ভালবাসা সম্ভব না। তবে আমাদের মধ্যে ভালবাসার প্রচলিত যে সংজ্ঞা আছে তা আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয় না। একটু ভাল করে চিন্তা করে যদি দেখি, তাহলে বুঝতে পারব যে, “আমি তোমাকে ভালবাসি” বলে আমি আসলে আমার নিজেকে ভালবাসি।কিভাবে? আমি একটা মেয়েকে ভালবাসি কারন ওই মেয়েকে আমার ভাল লাগে, তার সাথে থাকলে আমার ভাল লাগে, তার কথা আমার ভাল লাগে। সবি কিন্তু আমার নিজের ভাল লাগার জন্য। কাজেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমি তার ভাল লাগার জন্য কি করি? তার ভাল লাগার জন্য কিছু করে আমি আনন্দ পাই কিনা? যদি পাই তাহলে আমি বলব সেটা হল আসল ভালবাসা। সাধারণত আমরা যখন খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাই, তখনই আমরা স্বার্থপর হয়ে যাই। 'তুমি না থাকলে আমি বাচব না, আত্মহত্যা করব' - এটা খুবি স্বার্থপরসুলভ একটি উক্তি। আত্মহত্যা করা হচ্ছে স্বার্থপরতার চূড়ান্ত নিদর্শন। স্বার্থপরতার আরেকটি উদাহরন হচ্ছে সবার কাছে নিজেকে ভাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আকুল চেষ্টা। সমাজে যখন অবিচার হয়, কেউ যখন খারাপ কাজ করে, অন্যায় করে, তখন কেউই এগিয়ে যায় না। অনেকে কিছু বলে না কারন ওই লোকদের কাছে সে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। সে তার স্বার্থ দেখে। কাজেই সমাজের কিছু সংখ্যক লোক কি মনে করবে, তাদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা থাকবে কি থাকবে না সেটা চিন্তা করে আমি কি ন্যায়-বিচার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখব? খারাপকে ভাল বলতে থাকব? খারাপ ও ভালকে মিশিয়ে ফেলব? এমনও হতে পারে যে, সমাজের সবাই ভুল পথে আছে, যেভাবেই হোক আমার কাছে জ্ঞান এসেছে সবাই ভুল। তখন আমি কি করব? নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে চুপ করে বসে থাকব? অনেক মুসলিমরা আজ এ কাজ করছে। তারা যখন চার বিয়ের কথা বলে তখন মুসলমানরা আমতা আমতা করে, বিভিন্নভাবে কুর'আনকে ও ইসলামকে নিজের মনের মত করে সাজাতে থাকে। মূল কথা হচ্ছে , কেউ যখন তার আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে, তার ভালবাসাকে আল্লাহর মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টির মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবে, তার জন্য প্রত্যেক মানুষকে ভালবাসা খুব একটা কঠিন বলে মনে হয় না।


অনেকে বলে যে, একজন ছেলে অন্য মেয়েদের ভোগ করার জন্য জোর করে একের অধিক বিয়ে করে, সেটা কি ঠিক নাকি? এর উত্তর সহজ। কেউ কাউকে জোর করে বিয়ে করলে তো সেটা বিয়েই হবে না। কাজেই কেউ যদি ইসলাম কে অমান্য করে কোন একটা কাজ করে সেটার দায় ইসলামকে নিতে হবে কেন? একজন মেয়ে অবশ্যই তার পছন্দমত বিয়ে করবে। এখানে একের অধিক বিয়ের কথা বলা হচ্ছে উভয় পক্ষের সম্মতি নিয়েই। কোন মেয়ে সেরকম ছেলেকে বিয়ে না করতে পারে যার স্ত্রী আছে। এটা তার পছন্দ। কিন্তু কোন মেয়ে যদি সব জেনে শুনেই বিয়ে করতে চায় ? এখন কোন মেয়ের স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, এবং মেয়েটা জানে যে তার স্বামী সৎ, তার স্বামীর উদ্দেশ্য ভাল তাহলে তার স্বামীকে বাধা দেয়া উচিত না। কোন ছেলে যদি শুধুমাত্র ভোগ করার জন্য একের অধিক বিয়ে করতে চায়, তাহলে আমার বলতে হচ্ছে যে, সে মুসলিম না। আর এ ধরনের ছেলেকে তো মেয়েই দেয়া যাবে না। আর তার স্ত্রীকেও তাকে ত্যাগ করা উচিত যদি না সে অনুশোচনা করে ভাল হয়। কাজেই এখানে সবকিছু হতে হবে স্বতস্ফূর্তভাবে, নিজের সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছায়। নিজের ইচ্ছাতেই কোন মেয়ে যদি কাউকে স্বামী হিসেবে পেতে চায় সেখানে আমরা শুধু শুধু নারী অধিকার ইত্যাদি স্লোগান তুলে বাধা দিতে যাব কেন? আমি কোন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তার দেয়ার পর সে যদি আনন্দের সাথে রাজী হয়? কোন ছেলে যদি কোন মেয়েকে বিয়ে করে তাকে নিরাপত্তা দিতে চায় তার আশেপাশের মানুষেরা কেন তার পেছনে লাগব? অথচ কোন ছেলে যখন ইচ্ছেমত 'গার্ল ফ্রেন্ড' বানিয়ে যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে তখন আমাদের কিছু হয় না। আমাদের ভাব সাব এরকম যে ওই ছেলে নারীদের খুব সম্মান করছে। টেলিভিশনে পণ্যের বিজ্ঞাপনে যখন নারীকে নগ্ন করে উপস্থাপন করা হয় তখন যে কেন তথাকথিত নারী অধিকারবাদীরা সোচ্চার হয় না তা আমার একদমই বোধগোম্য নয়। এই সামান্য জ্ঞান যদি আমাদের মাঝে না থাকে, তাহলে আমাদের কি জ্ঞান আছে?


অনেকে বলে যে, ছেলেরাই কেন শুধু চার বিয়ে করতে পারবে, মেয়েরা কেন নয়? হুম, ছেলে-মেয়ের প্রকৃতি, আচার-আচরণ, ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়গুলো বুঝলে এটা খুব সহজেই বুঝে আসার কথা। চিন্তা করা যাক একটা মেয়ের চার জন স্বামী আছে। প্রথম সমস্যা হবে যখন তার সন্তান হবে। কার সন্তান? উত্তর হচ্ছে ডি,এন,এ টেস্ট করে খুব সহজেই জানা যাবে। কিন্তু পৃথিবীর কয়জন মানুষের ডি,এন,এ টেস্ট করানোর সামর্থ্য আছে? আচ্ছা এবার অন্য বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করা যাক। মেয়েকে চারটা বাসায় চার জন স্বামীর জন্য আলাদা আলাদা ভাবে সময় দিতে হবে। চার জন স্বামীই যখন বাইরে থেকে কাজ করে এসে বাসায় ফিরবে তখন কি হবে? তথাকথিত আধুনিক চিন্তাবিদরা বলবে যে, কেন সে স্বামী নিজের কাজ তো নিজেই করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তারা একজন ছেলে ও মেয়ের প্রকৃতি কি সেটা ভুলে গেছে। আমি একজন ছেলে। আমি জানি ছেলেরা কি রকম। ছেলেরা হল অনেকটা অস্থির প্রকৃতির। আমি যখন সারাদিন কাজ করে বাসায় এসে শূণ্য বাসা পাই তখন আমার ভিতরটা প্রচন্ড অস্থির হয়ে যায়। যখন কোন ছেলে ঘরে এসে শান্তি পায় না, তখনই সে বাইরে গিয়ে বিভিন্নভাবে শান্তি খোজার চেষ্টা করে। একজন মেয়ে তার স্বামীর স্মৃতি নিয়ে সময় কাটাতে পারে, স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু ছেলেরা পারে না। এটাই বাস্তব। আর আজ আমরা এই বাস্তবতা থেকে দূরে বলেই আমাদের সমাজের এই অবস্থা। তাও না হল মেনে নিলাম। কিন্তু যখন সন্তান হবে তখন? আগেই বলেছি সন্তানের জন্য দরকার সার্বক্ষনিক সাহচর্য। চারজন স্বামীর সন্তানদের লালন-পালন করা তখন একজন মেয়ের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। মোটকথা একজন মেয়ের চার বিয়ে হল অবাস্তব ও তর্কের জন্য তৈরি করা কল্পনা মাত্র।


অনেকে বলতে পারে যে, আচ্ছা সবকিছু মানলাম, কিন্তু যখন কোথাও ছেলের সংখ্যা মেয়ের তুলনায় খুব বেশি হবে তখন? তবে কিছু ব্যাপার লক্ষ্য করি। একজন মেয়ে সন্তানের রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা বেশি। কাজেই সাধারনভাবে মেয়ের সন্তানের সংখ্যা বেশি হয়। আবার, যুদ্ধ বা অন্যান্য ক্ষেত্রে ছেলেদেরই প্রাণ দিতে হয় বেশি। ইরাক, প্যালেস্টাইন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ছেলেরা অস্থির প্রকৃতির। মেয়েরা অনেক বেশি স্পর্শকাতর। মেয়েরা মা, তারা মানুষ তৈরি করে। পরিবার হচ্ছে সমাজের কেন্দ্র আর তার পালনকর্তা হল মেয়েরা। কাজেই আল্লাহ সেভাবেই আমাদের জন্য নিয়ম তৈরি করেছেন।


আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে আমরা সবাই কারো না কারো কাছে নিজেকে সমর্পণ করি। বেশিরভাগ সময়েই সেই সংখ্যাটা হয় অনেক। কেউ তার বস এর কাছে, কেউ তার বন্ধুদের কাছে, কেউ টাকার কাছে, কেউ স্ট্যাটাস এর কাছে। এতসব জিনিসের কাছে সমর্পণ করার চেয়ে নিজের স্রষ্টার কাছে সমর্পণ করা অনেক ভাল এবং সেটাই হচ্ছে পৃথিবীর জিনিসের কাছে মাথা নত না করার একমাত্র পথ। ইসলাম নারীদের সম্মান নিশ্চিত করেছে এবং সমাজকে স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু ঠিক করে দিয়েছে। আমাদের আশেপাশে যা কিছু হচ্ছে তার সবগুলোই ঠিক কিনা আমাদের ভালভাবে চিন্তা করে দেখা দরকার।


আমি আল্লাহর কাছে আমার ভূল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাই। যারা জ্ঞান চায় আল্লাহ তাদের জ্ঞান দিক।


Tuesday, May 6, 2008

হিল্লা বিয়ে